8.8 C
London
October 24, 2026
TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিকবাংলাদেশ

বিশ্বের শীর্ষ ঋণগ্রস্ত দেশ যুক্তরাষ্ট্রঃ ১৫ বছরে বাংলাদেশের ঋণ বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ

বিশ্বের সরকারি ঋণের পরিমাণের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ ৪১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১২৭ শতাংশ। অন্যদিকে বৈশ্বিক ঋণের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সরকারি ঋণের পরিমাণ ২০৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ। ২০১০ সালে বাংলাদেশের ঋণের পরিমাণ ছিল ৪০ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ গত দেড় দশকে দেশের সরকারি ঋণ বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার বরাত দিয়ে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকারি ঋণের বোঝা বাড়ার পাশাপাশি সুদ পরিশোধের ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামো ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া কঠিন হয়ে উঠছে।

আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ঋণের পরিমাণের হিসাবে চীন রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে। দেশটির ঋণের পরিমাণ ২২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১০৪ শতাংশ। তৃতীয় অবস্থানে থাকা জাপানের সরকারি ঋণ ৮ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির জিডিপির ১৯৯ শতাংশ।

যুক্তরাজ্য রয়েছে চতুর্থ অবস্থানে। দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ ৪ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১০২ শতাংশ। পঞ্চম স্থানে থাকা ফ্রান্সের সরকারি ঋণ ৪ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১১৮ শতাংশ। এ ছাড়া ইতালির সরকারি ঋণ ৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১৩৮ শতাংশ। জার্মানির ঋণ ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ৬৫ শতাংশ। আর ৩ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার সরকারি ঋণ নিয়ে ভারত রয়েছে তালিকার সপ্তম স্থানে। দেশটির ঋণ-জিডিপি অনুপাত ৮৩ শতাংশ।

বাংলাদেশের ঋণ-জিডিপি অনুপাত যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও ইতালির তুলনায় কম হলেও গত দেড় দশকে ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ঋণের বোঝা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে মোট ঋণের পাশাপাশি অর্থনীতির আকার, সরকারের রাজস্ব আয় এবং সুদ পরিশোধের সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। ঋণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুদ পরিশোধের ব্যয় বেড়ে গেলে উন্নয়ন ও জনসেবামূলক খাতে সরকারের ব্যয় করার সুযোগ সীমিত হতে পারে।

সরকার সাধারণত সরকারি বন্ড বিক্রি করে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ঋণ সংগ্রহ করে। বিনিয়োগকারীরা সরকারকে অর্থ দেওয়ার বিনিময়ে নির্দিষ্ট হারে সুদ পান এবং নির্ধারিত মেয়াদ শেষে মূল অর্থ ফেরত পাওয়ার কথা থাকে। সরকারি বন্ডের ইল্ড বা সুদের হার সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বন্ডের দাম কমলে সাধারণত এর ইল্ড বেড়ে যায়, ফলে নতুন ঋণ সংগ্রহে সরকারকে বেশি সুদ দিতে হতে পারে।

ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্সের সরকারি ঋণ ও ঋণের সুদ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির ১০ বছর মেয়াদি সরকারি ঋণের সুদের হার প্রায় ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। বিপরীতে জার্মানির ক্ষেত্রে এই হার ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। ইতালি ও গ্রিসের তুলনায়ও ফ্রান্সকে বেশি সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০১০ থেকে ২০১২ সালের ইউরোজোন ঋণসংকটের সময় গ্রিস, ইতালি ও স্পেনের মতো দেশগুলোকে ৫ শতাংশ বা তার বেশি সুদে ঋণ নিতে হয়েছিল। সুদের হার ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার পর আয়ারল্যান্ড ও পর্তুগালকে আন্তর্জাতিক সহায়তা নিতে হয়। ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাজেট এবং সরকারি ব্যয় কমানোর উদ্যোগ ঘিরে অসন্তোষও দেখা দিয়েছে। প্রতিবেদনে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, গত শনিবার দেশজুড়ে ৫ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেয়।

ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের (আইআইএফ) তথ্য অনুযায়ী, সরকার, পরিবার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বিশ্বে মোট ঋণ বেড়েছে ১০ ট্রিলিয়ন ডলার। গত জুনের শেষে বৈশ্বিক ঋণের পরিমাণ ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। বিশ্বের জনসংখ্যার হিসাবে মাথাপিছু গড় ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৪ হাজার ডলার। তবে এটি প্রত্যেক ব্যক্তির ব্যক্তিগত ঋণ নয়; বরং বিশ্বের মোট ঋণকে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে পাওয়া গড় হিসাব।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বৈশ্বিক ঋণ বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো থেকে। একই সময়ে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো গত এক বছরে সরকারি বন্ডের সুদ পরিশোধে ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করেছে। এই ব্যয় বিশ্বের সামরিক খাতে ৩ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে ২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের চেয়েও বেশি।

সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় বাড়লে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য জনসেবামূলক খাতে অর্থ বরাদ্দের সুযোগ কমতে পারে। বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে সরকারকে কর বাড়ানো অথবা অন্যান্য খাতে ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। সরকারি ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়লে বেসরকারি খাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। বাড়ি কেনার বন্ধকি ঋণ, গাড়ি কেনার ঋণ ও ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ ফ্রান্সের সরকারি ঋণ জিডিপির ১২১ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এতে দেশটির সরকারি অর্থব্যবস্থাকে টেকসই অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঋণের পরিমাণ ও সুদ পরিশোধের ব্যয় বাড়তে থাকায় সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং ঋণের টেকসই ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ঋণের প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি তা পরিশোধের সক্ষমতা ও অর্থনীতিতে ঋণের কার্যকর ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।

সূত্রঃ আল-জাজিরা

এমকে

আরো পড়ুন

ইটালি-আলবেনিয়া চুক্তি চিকিৎসা সংক্রান্ত নৈতিকতার লঙ্ঘনঃ এনজিও

সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তানের নিরাপত্তা জোটে ইরানকে যুক্ত করার উদ্যোগ

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরকে ‘গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ’ দেখছেন সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক