TV3 BANGLA
বাংলাদেশ

বোয়িং ডিলের ছায়ায় বিমানের এমডির পতনঃ অপরাধ না পরিকল্পিত অপসারণ?

রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় উড়োজাহাজ কেনাকাটার সিদ্ধান্ত যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, ঠিক সেই মুহূর্তে নাটকীয়ভাবে গ্রেপ্তার হলেন সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সাফিকুর রহমান। যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সঙ্গে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার চুক্তি স্বাক্ষরের আগমুহূর্তে তার বিরুদ্ধে আনা হয় ‘গৃহকর্মী নির্যাতন’–এর অভিযোগ।

প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি একটি সাধারণ ফৌজদারি মামলা মনে হলেও, এভিয়েশন খাতের ভেতরের আলোচনা এবং প্রশাসনিক সূত্রগুলো ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই গ্রেপ্তারের টাইমিং মোটেই কাকতালীয় নয়; বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত অপসারণ প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে, যার লক্ষ্য ছিল বোয়িংয়ের সঙ্গে বহুল আলোচিত চুক্তির পথে থাকা ‘বাধা’ সরানো।

বিমান সূত্রে জানা গেছে, বোয়িংয়ের প্রস্তাবিত ১৪টি উড়োজাহাজ—ড্রিমলাইনার ৭৮৭-১০ ও ৭৩৭ ম্যাক্স—কেনার মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৩.২ বিলিয়ন ডলার। টেকনিক্যাল কমিটি ও এমডি সাফিকুর রহমান এই কেনাকাটায় আরও অন্তত ১০ শতাংশ ছাড়, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন সুবিধা এবং বিকল্প হিসেবে এয়ারবাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক দরকষাকষির পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিমানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “ একটি প্রভাবশালী মহল দ্রুত চুক্তি সই করতে চাচ্ছিল। এমডি বিষয়টি যাচাই-বাছাই ছাড়া এগোতে রাজি হননি। তিনি সময় নিতে চেয়েছিলেন, সেটিই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।”

উত্তরায় এমডির বাসভবন থেকে ১১ বছর বয়সী এক গৃহকর্মী উদ্ধারের ঘটনায় পুলিশ মামলা দায়ের করে তাকে গ্রেপ্তার করে। তবে প্রশ্ন উঠেছে—যদি নির্যাতন দীর্ঘদিনের হয়ে থাকে, তাহলে এতদিন কোনো অভিযোগ বা অনুসন্ধান হয়নি কেন? এবং কেন চুক্তির সবচেয়ে স্পর্শকাতর সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা হঠাৎ এতটা জোরালো হলো?

এভিয়েশন সংশ্লিষ্ট মহল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা চলছে—এই অভিযোগ কি আদৌ স্বতঃস্ফূর্ত, নাকি এটি কাউকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলা ও সামাজিকভাবে হেয় করার জন্য ব্যবহৃত পুরোনো কৌশল? অতীতে সরকারি ও রাষ্ট্রীয় সংস্থায় ভিন্নমতাবলম্বী কর্মকর্তাদের সরাতে এ ধরনের অভিযোগ ব্যবহারের নজির থাকার কথাও তুলে ধরছেন বিশ্লেষকেরা।

সরকারি ব্যাখ্যায় বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতেই বোয়িং থেকে বিমান কেনার সিদ্ধান্ত। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, ডলার সংকট ও বৈদেশিক ঋণের চাপের মধ্যে এই বিশাল অংকের কেনাকাটা বাস্তবতা বিবর্জিত এবং ঝুঁকিপূর্ণ।

অভিযোগ রয়েছে, এই প্রকল্পের সঙ্গে বহুস্তরীয় কমিশন ও মধ্যস্বত্বভোগী স্বার্থ জড়িত। এমডি সাফিকুর রহমান হয়তো সেই অনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হতে চাননি, অথবা তার পেশাদার অবস্থান ওই স্বার্থের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফলে তাকে সরিয়ে দেওয়াই ছিল সহজ সমাধান।

এমডির গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে বিমানের ভেতরে একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে গেছে—এই ৩৭ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের পথে কেউ বাধা হলে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। এখন প্রশ্ন উঠছে, এমডিকে সরানোর পর কি দ্রুত বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তি সই হবে? গৃহকর্মী নির্যাতনের অভিযোগের আড়ালে কি চাপা পড়ে যাবে হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য অনিয়ম?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে অনেকে বলেন,

” স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের তদন্ত ছাড়া এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলবে না।

অন্যথায়, এই ঘটনা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ইতিহাসে শুধু একজন এমডির পতন নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনায় আরেকটি কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।”

সূত্রঃ আজকের কন্ঠ

এম.কে

আরো পড়ুন

বাংলাদেশিদের অস্ত্রোপচার বাতিল করে বিপাকে কলকাতার হাসপাতালগুলো

নিউজ ডেস্ক

সিলেটে চিনি চোরাচালান চক্রের হোতা ছাত্রলীগের শীর্ষ ৪ নেতা

ভারতীয় হাইকমিশনারকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব

নিউজ ডেস্ক