TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ব্রিটেনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অ্যাসাইনমেন্ট জালিয়াতি এখন ‘ওপেন সিক্রেট’

ব্রিটেনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এসাইনমেন্ট ও প্রবন্ধ জালিয়াতি বন্ধে আইন কার্যকর হওয়ার প্রায় তিন বছর পার হলেও বাস্তবে এর কোনো দৃশ্যমান প্রভাব পড়েনি। বিবিসির এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এসাইনমেন্ট জালিয়াতি এখনো ব্যাপকভাবে চলমান এবং সংশ্লিষ্ট মহলে এটি কার্যত একটি “ওপেন সিক্রেট” হিসেবে পরিচিত।

 

২০২২ সালের এপ্রিল থেকে ইংল্যান্ডে পোস্ট-১৬ পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য অর্থের বিনিময়ে এসাইনমেন্ট লেখা, ব্যবস্থা করা বা এর বিজ্ঞাপন দেওয়া ফৌজদারি অপরাধ। তবে বিস্ময়করভাবে, এখন পর্যন্ত এই আইনের আওতায় কোনো মামলাই ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে শুনানির পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিস ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়—উভয়ই বিবিসিকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আইন থাকা সত্ত্বেও অনলাইনে অসংখ্য কোম্পানি এখনো যুক্তরাজ্যের শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে প্রবন্ধ বা এসাইনমেন্ট লেখার সেবা প্রচার করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশ্যে এই ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে ১,০০০ শব্দের প্রবন্ধের দাম শুরু হচ্ছে মাত্র ২০ পাউন্ড থেকে।

ইউনিভার্সিটি অব লিংকনের এক সাবেক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আলিয়া (ছদ্মনাম) জানান, তার মাস্টার্স কোর্সে বহু বিদেশি শিক্ষার্থী দীর্ঘ ইংরেজি প্রবন্ধ লিখতে ব্যর্থ হচ্ছিল। ভাষাগত দুর্বলতা ও পড়াশোনায় অনাগ্রহের কারণে অনেকে দ্রুতই ক্লাসে আসা বন্ধ করে দেয় এবং প্রবন্ধ লেখার কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

আলিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, যারা নিজেরা পরিশ্রম করে কাজ করছিলেন, তাদের উপহাস করা হতো। অনেক শিক্ষার্থী কেবল উপস্থিতি দিয়ে ক্লাস ছেড়ে দিত এবং ভালো নম্বর পেত। ফলাফল প্রকাশের সময় দেখা যায়, নকলের আশ্রয় নেওয়া শিক্ষার্থীরাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে এগিয়ে।

এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ী বার্কলে লিটলউড দাবি করেন, তিনি প্রবন্ধ বাণিজ্য থেকে মিলিয়ন মিলিয়ন পাউন্ড আয় করেছেন। তার কোম্পানির মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩,০০০ লেখক কাজ করেন, যাদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষকরাও রয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মাস্টার্স বা পিএইচডি পর্যায়ের প্রবন্ধের দাম ২০,০০০ পাউন্ড পর্যন্ত হতে পারে।

লিটলউড আরও দাবি করেন, তিনি নিজস্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি তৈরি করেছেন, যার মাধ্যমে কয়েক মিনিটেই “নিশ্চিত গ্রেড”-সহ বিশ্ববিদ্যালয় মানের প্রবন্ধ সরবরাহ করা সম্ভব। যদিও তিনি আইন ভাঙার অভিযোগ অস্বীকার করে একে “মডেল উত্তর” হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

সাবেক প্রভাষক স্টিভ ফস্টার বলেন, এসাইনমেন্ট জালিয়াতির ব্যাপকতা ছিল একটি প্রকাশ্য গোপন বিষয়। তিনি জানান, ভাষায় দুর্বল শিক্ষার্থীরা হঠাৎ করে নিখুঁত ও উচ্চমানের প্রবন্ধ জমা দিলে সন্দেহ হওয়াই স্বাভাবিক। এক পরীক্ষায় ২% আর প্রবন্ধে ৯৯% পাওয়ার মতো চরম বৈষম্য নকলের স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।

ফস্টারের দাবি, অনেক শিক্ষক ইচ্ছাকৃতভাবে এসব অনিয়ম উপেক্ষা করেছেন, যার ফলে সমস্যা ক্রমেই গভীর হয়েছে। তার মতে, এর ফলে ভবিষ্যতে পেশাগত দক্ষতা ও জননিরাপত্তা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের উচ্চ ফি’র ওপর নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আর্থিক চাপে রয়েছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমে গেলে ব্রিটেনের প্রতি দশটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে চারটির বেশি আর্থিক সংকটে পড়তে পারে।

২০২৩–২৪ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার বিদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত ছিলেন, যা মোট শিক্ষার্থীর এক-চতুর্থাংশ। বিবিসির তথ্য অধিকার আইনে করা আবেদনের জবাবে ৫৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৪৮টি জানিয়েছে—একাডেমিক অসদাচরণের তদন্তে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা অনুপাতে বেশি।

ইউনিভার্সিটি অব লিংকনের ক্ষেত্রে চিত্র আরও উদ্বেগজনক। সেখানে মোট তদন্তের ৭৮ শতাংশই ছিল অ-যুক্তরাজ্য শিক্ষার্থী, অথচ তাদের সংখ্যা মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ২২ শতাংশ।

নকল শনাক্তে টার্নইটিনের মতো সফটওয়্যার ব্যবহার করা হলেও, এআই প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে এই চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হয়ে উঠেছে। টার্নইটিন জানিয়েছে, ২০২৩ সালের পর পর্যালোচিত প্রতি দশটির বেশি একটিতে অন্তত ২০ শতাংশ লেখা এআই দ্বারা তৈরি।

শিক্ষাবিদরা সতর্ক করে বলছেন, প্রবন্ধভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এখন আর কার্যকর নয়। অ্যাকাডেমিক সততা রক্ষায় মূল্যায়নের ধরন বদলানো না হলে ব্রিটিশ উচ্চশিক্ষার মান ও ডিগ্রির বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এই বাস্তবতায় আলিয়ার মতো সৎ শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন—একই ডিগ্রি হাতে নিয়ে একজন নিয়োগকর্তা কীভাবে পরিশ্রমী ও নকলনির্ভর শিক্ষার্থীর মধ্যে পার্থক্য করবেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন চাপের মুখে ব্রিটেনের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা।

সূত্রঃ বিবিসি

এম.কে

আরো পড়ুন

হিথ্রো বিমানবন্দরে যাত্রীর স্যুটকেস হতে চারশো হাজার পাউন্ড উদ্ধার

কোলচেস্টার চিড়িয়াখানায় দারাকে দেখতে এসেছিলেন কিং চার্লস

নিউজ ডেস্ক

যুক্তরাজ্যে বড় ধরনের বিপর্যয়ে লেবারঃ জরিপে রিফর্মের অপ্রতিরোধ্য উত্থান