ব্রিটেনে সবার জন্য ব্যবহারকালীন বিনামূল্যে সামাজিক সেবা চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। ইংল্যান্ডের বর্তমান সামাজিক সেবা ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার এনে ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের (এনএইচএস) আদলে একটি নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য জানিয়েছেন তিনি।
লিভারপুলে লেবার পার্টির সম্মেলন শুরুর সময় বিবিসির লরা কুয়েনসবার্গকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বার্নহ্যাম বলেন, ভেঙে পড়া সামাজিক সেবা ব্যবস্থা ঠিক করতে তিনি বড় ধরনের পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, এই পরিবর্তনের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি থাকলেও কাউকে না কাউকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন সামাজিক সেবা ব্যবস্থা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং ব্যবহার করার সময় অর্থ দিতে হবে না। তবে এই ব্যবস্থার অর্থায়ন কীভাবে হবে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়নি।
বার্নহ্যাম জানান, এই ব্যবস্থা সবার অবদানের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। তবে বর্তমানে এনএইচএস যেভাবে সাধারণ করের মাধ্যমে অর্থায়ন করা হয়, ঠিক একই পদ্ধতিতে এটি পরিচালিত হবে কি না, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ বিষয়ে ব্যারোনেস কেসির পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে।
পরিকল্পনাটি পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের আগে বাস্তবায়ন করা হবে না বলেও স্পষ্ট করেছেন বার্নহ্যাম। বর্তমানে ২০২৯ সালে সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা। তিনি জানান, লেবার পার্টি পরবর্তী নির্বাচনী ইশতেহারে এই প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করবে। এর মাধ্যমে নির্বাচনের সময় ভোটারদের কাছ থেকে এই পরিকল্পনার বিষয়ে সমর্থন নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
ইংল্যান্ডের বর্তমান সামাজিক সেবা ব্যবস্থার সমালোচনা করে বার্নহ্যাম বলেন, সমাজের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ এই ব্যবস্থায় তাদের সম্পদ ও সঞ্চয় হারানোর ঝুঁকিতে থাকেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সঙ্গে ইংল্যান্ডের বর্তমান সামাজিক সেবা ব্যবস্থার তুলনা করেন।
তবে দেশজুড়ে নতুন ব্যবস্থা চালু করা ব্যয়বহুল ও জটিল হতে পারে বলেও স্বীকার করেছেন প্রধানমন্ত্রী। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে সরকারি অর্থের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি না করার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার কথা জানান তিনি।
নতুন সামাজিক সেবা ব্যবস্থা পরিচালনার সম্ভাব্য বার্ষিক ব্যয় নিয়ে বার্নহ্যাম বলেন, এর পরিমাণ ১৮ বিলিয়ন পাউন্ডের যে হিসাব বলা হয়েছে, প্রকৃত ব্যয় তার চেয়ে কম হতে পারে। তবে কীভাবে ন্যায্যভাবে এই অর্থ সংগ্রহ করা হবে, তা নির্ধারণে আরও সময় প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
সামাজিক সেবা সংস্কারের বিষয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন বার্নহ্যাম। তার বাবা রয় বার্নহ্যাম দুই সপ্তাহ আগে আলঝেইমার্স রোগে মারা যান। বাবার যত্ন নেওয়া কর্মীদের প্রশংসা করে তিনি বলেন, তারা কম বেতনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।
সামাজিক সেবা সংস্কার বার্নহ্যামের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার। ২০০৯ সালে স্বাস্থ্যসচিব থাকার সময় তিনি এনএইচএসের আদলে জাতীয় কেয়ার সার্ভিস চালুর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে ওই পরিকল্পনার অর্থায়ন নিয়ে তৎকালীন কনজারভেটিভ পার্টির তীব্র সমালোচনা হয়েছিল এবং সেটিকে ‘ডেথ ট্যাক্স’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। ২০১০ সালের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পরাজিত হওয়ার পর সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়িত হয়নি।
পুরোনো পরিকল্পনায় ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাইলে বার্নহ্যাম বলেন, কোনো বিকল্পই আলোচনার বাইরে নয়। তবে তিনি ২০১০ সালের প্রস্তাব হুবহু ফিরিয়ে আনবেন না বলেও ইঙ্গিত দেন।
সামাজিক সেবা সংস্কারে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্যের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে কোনো প্রস্তাব নিয়ে জনগণের মধ্যে ভয় তৈরি করা হলে প্রয়োজনীয় সংস্কার এগিয়ে নেওয়া কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে ব্রিটেনের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও সতর্কতার কথা জানিয়েছেন বার্নহ্যাম। আর্থিক বাজারে ব্রিটিশ অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে বলে স্বীকার করে তিনি বলেন, বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও বর্তমানে অস্থির।
সরকারি ব্যয় কমিয়ে অর্থের ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়ে তিনি প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন। পাশাপাশি গৃহহীনতা ও তরুণদের বেকারত্বের মতো সমস্যায় দীর্ঘমেয়াদি ও আরও কার্যকর পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে সরকারি অর্থ সাশ্রয়ের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি।
আগামী বাজেটের আগে সরকারি অর্থব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে চ্যান্সেলর জন হিলি অর্থনীতি পরিচালনায় অত্যন্ত সতর্ক থাকবেন বলে জানান বার্নহ্যাম। তিনি বলেন, আগের কনজারভেটিভ সরকারের মতো অর্থনীতিতে ঝুঁকি নেওয়া হবে না।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এমকে

