বাংলাদেশে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উত্তেজনা বাড়তে থাকে, বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে। এর প্রভাব পড়ে জ্বালানি সরবরাহসহ দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে, ফলে শুরু থেকেই একটি জটিল বৈশ্বিক বাস্তবতায় পথচলা শুরু করতে হয়েছে নতুন সরকারকে।
এই প্রেক্ষাপটে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে ঢাকা। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ সফর করছেন, যেখানে বাংলাদেশের শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করাই মূল লক্ষ্য।
একইসঙ্গে চলতি সপ্তাহে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরের কথা রয়েছে, আর বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্র সফরে অবস্থান করছেন। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. পল কাপুরও বাংলাদেশ সফর করেছেন।
সবমিলিয়ে পররাষ্ট্র অঙ্গনে ব্যস্ত সময় পার করছে বাংলাদেশ। তবে এর মধ্যেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি কোন দিকে ঝুঁকছে।
দীর্ঘ সময় ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশকে ভারতঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখা হতো। পরবর্তীতে শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটে, একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ হয়ে ওঠে। এখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে—বাংলাদেশ কি ভারত, চীন নাকি যুক্তরাষ্ট্র—কোনো একটি শক্তির দিকে ঝুঁকছে?
সরকার অবশ্য এই ধারণা নাকচ করেছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানিয়েছেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো নির্দিষ্ট দেশকেন্দ্রিক নয়, বরং জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই পরিচালিত হচ্ছে। তার ভাষায়, সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাই সরকারের লক্ষ্য।
তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে এই নীতি প্রথম বড় পরীক্ষার মুখে পড়ে ইরান যুদ্ধকে ঘিরে। বাংলাদেশ শুরুতে উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের হামলার সমালোচনা করলেও ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিষয়ে সরাসরি কিছু বলেনি। পরে সমালোচনার মুখে নতুন বিবৃতি দেওয়া হলেও সেটি নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করে ইরান। বাংলাদেশে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদি বলেন, এই বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান আরও স্পষ্ট হওয়া উচিত ছিল।
এই প্রেক্ষাপটে দেশের ভেতরে প্রশ্ন উঠেছে—বাংলাদেশ কি যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকছে? বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে হওয়া বাণিজ্যচুক্তি এবং বর্তমান কূটনৈতিক তৎপরতা সেই আলোচনাকে আরও জোরদার করেছে। তবে সরকার বলছে, সব সিদ্ধান্তই নেওয়া হচ্ছে জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায়।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে জ্বালানি ও নিরাপত্তার প্রশ্নে ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা জরুরি, অন্যদিকে রপ্তানি বাজার হিসেবে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ। আবার শিল্প ও অবকাঠামো খাতে চীনের বিনিয়োগও দেশের অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. লাইলুফার ইয়াসমিন মনে করেন, তিস্তা প্রকল্পের মতো ইস্যুগুলোতে বাংলাদেশের অবস্থানই ভবিষ্যতে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে। কারণ এখানে একাধিক শক্তিধর দেশের স্বার্থ জড়িত, যা সামাল দেওয়া সহজ নয়।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র তাদের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের সঙ্গে বাংলাদেশকে যুক্ত করতে আগ্রহী বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, যা আবার চীনের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। ফলে বড় শক্তিগুলোর পারস্পরিক প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশকে সতর্ক কৌশল নিতে হবে।
সাবেক কূটনীতিকদের মতে, অতীতে কোনো একটি দেশের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ার কারণে বাংলাদেশকে মূল্য দিতে হয়েছে। তাই এখন সেই ভুল এড়িয়ে চলা জরুরি। তাদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও বাণিজ্য—সবকিছুই একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত, ফলে কোনো একটি পক্ষকে বাদ দিয়ে অন্যকে বেছে নেওয়ার সুযোগ নেই।
সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, “বাংলাদেশ প্রথম” নীতি বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রভাবশালী দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় চাপ সৃষ্টি করতেই থাকবে। সেই চাপ সামলে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখতে পারাটাই হবে নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
সূত্রঃ বিবিসি বাংলা
এম.কে

