ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে ইহুদিদের ভারতের পরিবর্তে পাকিস্তানের পক্ষ নেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন ইসরায়েলি-আমেরিকান অর্থোডক্স রাব্বি (ইহুদি ধর্মীয় নেতা) ইয়োসেফ মিজরাহি। তার এই বক্তব্য ঘিরে ভারতীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত ও সামরিক সম্পর্কের বিপরীতে তার এমন অবস্থান নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
গত ৩ নভেম্বর ‘ভেরি ইমপর্ট্যান্ট প্রিন্সিপলস ফর লাইফ—ইলেকশনস অ্যান্ড কারেন্ট ইভেন্টস’ শীর্ষক একটি ধর্মীয় আলোচনায় এসব মন্তব্য করেন মিজরাহি। পরবর্তী সময়ে তার বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ৬ নভেম্বর ভারতের সংবাদমাধ্যম নিউজ২৪ অনলাইন এ নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
মিজরাহির বক্তব্যের মূল ভিত্তি ছিল ইহুদি ধর্মগ্রন্থ তোরাহর ব্যাখ্যা। তিনি ভারত ও পাকিস্তানের ধর্মীয় বিশ্বাসের পার্থক্য তুলে ধরে বলেন, পাকিস্তান মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এবং সেখানে এক স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস প্রচলিত। অন্যদিকে, ভারতের হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যে বিভিন্ন দেবদেবীর উপাসনা ও মূর্তিপূজার প্রচলন রয়েছে। তার ধর্মীয় ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মূর্তিপূজার চেয়ে একেশ্বরবাদকে সমর্থন করাই ইহুদিদের জন্য অধিক গ্রহণযোগ্য।
তিনি যুক্তি দেন, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কোনো যুদ্ধ হলে ইহুদিদের পাকিস্তানের পক্ষ নেওয়া উচিত। তার মতে, এই অবস্থানের কারণ পাকিস্তানের সঙ্গে ইসরায়েলের বন্ধুত্ব নয়; বরং ধর্মীয় বিশ্বাস ও একেশ্বরবাদের প্রশ্ন।
বক্তব্যে মিজরাহি ইসরায়েল ও ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টিও স্বীকার করেন। প্রতিরক্ষা, সামরিক সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক খাতে দুই দেশের অংশীদারত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাস্তব রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিবেচনায় ভারতের পক্ষ নেওয়াই স্বাভাবিক হতে পারে। কিন্তু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে তার অবস্থান ভিন্ন।
তিনি কার্যত রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের চেয়ে ধর্মীয় নীতিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। এমনকি পাকিস্তানের সঙ্গে ইসরায়েলের বৈরী সম্পর্ক থাকলেও তার ধর্মীয় ব্যাখ্যায় সেটি পাকিস্তানের পক্ষে থাকার ক্ষেত্রে বাধা হওয়া উচিত নয় বলে ইঙ্গিত দেন।
এর আগে হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাস ও ভারতীয় সংস্কৃতি নিয়েও বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন মিজরাহি। গত ২৮ অক্টোবর প্রচারিত আরেকটি ধর্মীয় আলোচনায় তিনি হিন্দুদের গরুর প্রতি শ্রদ্ধা, গো-সেবা এবং গোমূত্র ব্যবহারের বিষয় নিয়ে বিদ্রূপ করেন। তার ওই বক্তব্যের ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে ভারত ও ইসরায়েলের বিভিন্ন মহলে সমালোচনা শুরু হয়।
ভারতের সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে ৩০ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, হিন্দু ধর্মীয় রীতিনীতি নিয়ে মিজরাহির মন্তব্যের পর ভারতীয়দের পাশাপাশি ইসরায়েলি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের একাংশও তার সমালোচনা করেন। ফিলিস্তিনের ভারতীয় দূতও ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঐতিহ্যকে অপমান করার বিরুদ্ধে অবস্থান জানিয়ে বক্তব্য দেন।
সর্বশেষ পাকিস্তানের পক্ষে থাকার আহ্বান জানিয়ে দেওয়া বক্তব্যের পর ভারতীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের প্রসঙ্গ টেনে প্রশ্ন তুলেছেন।
ভারত ও ইসরায়েলের কৌশলগত সম্পর্ক এবং পাকিস্তানের সঙ্গে ইসরায়েলের বৈরী অবস্থানের বিপরীতে একজন ইহুদি ধর্মীয় নেতার এমন বক্তব্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ধর্মীয় বিশ্বাস, রাজনৈতিক স্বার্থ ও কূটনৈতিক সম্পর্কের পারস্পরিক টানাপোড়েন নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
সূত্রঃ ইন্ডিয়া টু’ডে
এমকে

