তেহরানজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ কিছুটা কমে এসেছে। সোমবার কয়েক লাখ মানুষ সরকারপন্থী সমাবেশে অংশ নেওয়ার পর পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে আসে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। তবে বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে দেশটির রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো অস্থিতিশীল রয়ে গেছে।
এই উত্তেজনার মধ্যেই ইরান প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর আকাশসীমা পুনরায় খুলে দেয়। সম্ভাব্য সামরিক হামলার আশঙ্কায় সাময়িকভাবে আকাশসীমা বন্ধ করা হয়েছিল, যার ফলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ফ্লাইট চলাচলে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটে।
যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতিকে ঘিরে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে “সব বিকল্পই খোলা রয়েছে।” একই সঙ্গে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের হত্যাকাণ্ড চলতে থাকলে তেহরানকে “ভয়াবহ পরিণতির” মুখোমুখি হতে হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
ওয়াশিংটন ইতোমধ্যে ইরান–সংক্রান্ত নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এসব নিষেধাজ্ঞায় এমন ব্যক্তিদের লক্ষ্য করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দমনে “নৃশংস অভিযানে” জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, দেশের সশস্ত্র বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে (ইউএনএসসি) ইরানের প্রতিনিধি গোলামহোসেইন দারজি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হুমকিকে আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের গুরুতর লঙ্ঘন বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, বিক্ষোভকারীদের সুরক্ষার মতো “মানবিক ভাষা” ব্যবহার করে বলপ্রয়োগকে বৈধতা দেওয়া আন্তর্জাতিক আইনের ইচ্ছাকৃত অপব্যবহার। তার মতে, এ ধরনের বেআইনি পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করা ইউএনএসসির নৈতিক ও আইনগত দায়িত্ব।
একই বক্তব্যে দারজি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানে অস্থিরতা তৈরির অভিযোগ তোলেন। তিনি দাবি করেন, ২০২৫ সালের জুনে ইরানের বিরুদ্ধে চালানো ১২ দিনের যুদ্ধে লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়ে এখন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা উসকে দেওয়া হচ্ছে, যাতে বিদেশি হস্তক্ষেপের অজুহাত তৈরি করা যায়।
জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব মার্থা পোবে সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার হুমকি পরিস্থিতিকে আরও বিস্ফোরক করে তুলছে। তার ভাষায়, বহিরাগত সামরিক চাপ ইতোমধ্যেই সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত অস্থিরতা যোগ করছে এবং যেকোনো মূল্যে উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
চীনও এই সংকটে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘে দেশটির উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি সান লেই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বলপ্রয়োগের হুমকির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর যুদ্ধের মেঘ জমছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সামরিক পদক্ষেপ কখনোই সমস্যার সমাধান নয়; বরং তা অঞ্চলটিকে আরও অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক অবস্থার দিকে ঠেলে দেবে।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্য ইরানের সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। জাতিসংঘে ব্রিটিশ উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি আর্চি ইয়ং ইরানের দমন-পীড়নকে “নৃশংস” আখ্যা দিয়ে বলেন, জনগণকে রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, নিপীড়ন চালানো নয়। সরকার যদি নীতি পরিবর্তন না করে, তাহলে ইরানের ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুঁশিয়ারি দিয়েছে লন্ডন।
এই প্রেক্ষাপটে ইরান সংকট শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতায় সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুতই একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ইস্যুতে রূপ নিচ্ছে, যেখানে যেকোনো ভুল পদক্ষেপ গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
সূত্রঃ আল জাজিরা
এম.কে

