ব্রিটেনের নতুন অভিবাসন নীতি ও কঠোর বিধিনিষেধ দেশটির অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। রাজনৈতিকভাবে ‘সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ’ ও ‘নেট জিরো মাইগ্রেশন’ স্লোগান জনপ্রিয়তা পেলেও, অর্থনৈতিক বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। বিশ্লেষকদের মতে, এই নীতির ফল হিসেবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই সরকারকে ব্যাপক কর বৃদ্ধির পথে হাঁটতে হতে পারে।
অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিসটিকস (ONS)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এক বছরে ব্রিটেনে নেট অভিবাসন ৬ লাখ ৪৯ হাজার থেকে কমে ২ লাখ ৪ হাজারে নেমে এসেছে, যা প্রায় ৬৮ শতাংশ হ্রাস। অর্থনৈতিক গবেষণাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী এক দশকে ব্রিটিশ কোষাগারে প্রায় ২০ বিলিয়ন পাউন্ড রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এই ঘাটতি পূরণে চ্যান্সেলরের সামনে কর বৃদ্ধি ছাড়া কার্যত আর কোনো বাস্তবসম্মত পথ থাকবে না।
রাজনৈতিক অঙ্গনে অভিবাসন বিরোধী বক্তব্যকে অনেকেই ইউরোপজুড়ে উত্থানশীল উগ্র-ডানপন্থী বয়ানের অংশ হিসেবে দেখছেন। কিন্তু এই বয়ানের আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে ব্রিটেনের অর্থনীতির নির্ভরশীল কাঠামো। বাস্তবতা হলো—দেশটির গুরুত্বপূর্ণ সেবাখাতগুলো দীর্ঘদিন ধরেই অভিবাসী শ্রমশক্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (NHS), কেয়ার হোম, সোশ্যাল কেয়ার এবং টিচিং কেয়ার খাতে অভিবাসীদের অবদান অপরিহার্য। গবেষণা বলছে, স্থানীয় শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ কর্মীদের মধ্যে এসব খাতে কাজ করার আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ফলে অভিবাসীরা কারও চাকরি দখল করছে—এমন দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; বরং তারা সেই শূন্যস্থান পূরণ করছে, যা না থাকলে রাষ্ট্রীয় সেবাব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
গত এক বছরে স্বাস্থ্য ও কেয়ার ভিসার সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্তে কর্মসংস্থান বাড়েনি। বরং হাসপাতাল, কেয়ার হোম ও সামাজিক সেবায় জনবল সংকট আরও তীব্র হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর—চিকিৎসা পেতে দেরি, কেয়ার সুবিধা সীমিত হওয়া এবং সেবার মানে অবনতি দেখা দিচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের প্রস্তাবিত ‘আর্নড সেটেলমেন্ট’ নীতি নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন (ILR) পাওয়ার সময়সীমা ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বা ১৫ বছর করার প্রস্তাব অভিবাসী পেশাজীবীদের মধ্যে গভীর অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। যেখানে একজন অভিবাসীকে মাত্র একবার আবেদন করতেই ৩ হাজার ২৯ পাউন্ড ফি দিতে হয় এবং নিয়মিত উচ্চ হারে ট্যাক্স প্রদান করতে হয়, সেখানে দীর্ঘ ১৫ বছর নাগরিকত্বহীন অবস্থায় রাখা ন্যায়সংগত নয় বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই অনিশ্চয়তার কারণে আন্তর্জাতিক দক্ষ জনশক্তি ক্রমেই ব্রিটেনের বদলে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা ইউরোপের অন্যান্য দেশের দিকে ঝুঁকছে। এর ফলে ব্রিটেন ভবিষ্যতে মেধা সংকট ও উৎপাদনশীলতা হ্রাসের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
গত কয়েক বছরে ব্রিটেন–বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি দক্ষ কর্মী, শিক্ষার্থী এবং বিশেষ করে কেয়ার খাতের কর্মী ব্রিটেনে এসেছেন। কেবল গত এক বছরেই কয়েক হাজার বাংলাদেশি এই খাতে যুক্ত হয়েছেন।
নতুন অভিবাসন নীতি ও আইএলআর-এর সময়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব তাদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও মানসিক চাপ তৈরি করেছে।
এই অনিশ্চয়তা শুধু অভিবাসীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তাদের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোকেও অর্থনৈতিক ও মানসিক সংকটে ফেলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট থেকে উত্তরণের একটি বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে ‘ফেয়ার সেটেলমেন্ট’ নীতি। নির্দিষ্ট সময় কাজ ও ট্যাক্স প্রদানের পর অভিবাসীদের স্থায়ী বসবাসের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে, তবে শর্ত হিসেবে নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত সরকারি বেনিফিট বা ফান্ড ব্যবহারের ওপর সীমাবদ্ধতা রাখা যেতে পারে।
এতে একদিকে অভিবাসীরা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, ঘরবাড়ি কেনা ও ব্যবসা সম্প্রসারণের আত্মবিশ্বাস পাবেন, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় কল্যাণ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে না। একই সঙ্গে এই নীতি ব্রিটেনের রাজস্ব ঘাটতি কমাতে এবং অর্থনীতিকে সচল রাখতে সহায়ক হতে পারে।
সূত্রঃ ও এন এস
এম.কে

