TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যে চরমপন্থা থেকে মানবসেবায়ঃ এক আফগান শরণার্থীর জীবন বদলের অনন্য গল্প

যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের এক কিশোর, যিনি একসময় তালেবানের প্রচারণায় প্রভাবিত হয়ে আত্মঘাতী হামলাকারী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন, আজ তিনি যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা (NHS)-এর একজন ফিজিওথেরাপিস্ট। আফগান-বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক ও স্বাস্থ্যকর্মী মাইওয়ান্ড বানায়ির জীবনগাথা শুধু ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্প নয়, বরং চরমপন্থা, যুদ্ধ, শরণার্থী জীবন এবং পুনর্গঠনের এক শক্তিশালী দলিল।

সম্প্রতি প্রকাশিত তার স্মৃতিকথা Delusions of Paradise: Escaping the Life of a Taliban Fighter-এ তিনি তুলে ধরেছেন কীভাবে কৈশোরে ধর্মীয় উগ্রবাদী মতাদর্শের প্রভাবে তিনি তালেবানে যোগ দিয়েছিলেন এবং কীভাবে পরবর্তীতে সেই বিশ্বাস থেকে বেরিয়ে এসে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি জীবন গড়ে তুলেছেন।

মাইওয়ান্ডের জন্ম ১৯৮০ সালে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে। সোভিয়েত আগ্রাসনের পর দীর্ঘ যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ এবং সহিংসতার পরিবেশে তার শৈশব কাটে। অল্প বয়সেই তিনি গোলাবর্ষণ, হত্যাকাণ্ড, অপহরণ এবং ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের সাক্ষী হন।

পরিস্থিতির অবনতিতে পরিবারসহ পাকিস্তারের শামশাতু আফগান শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেন তিনি। সেখানে ধর্মীয় মাদ্রাসায় পড়াশোনার সময় তাকে শেখানো হয় যে জিহাদ এবং শহীদ হওয়াই একজন মুসলমানের সর্বোচ্চ মর্যাদা। আত্মঘাতী হামলায় নিহত হলে জান্নাতে বিশেষ পুরস্কার, সম্মান ও সুখের জীবন অপেক্ষা করছে—এমন বিশ্বাস তার মতো অসংখ্য কিশোরের মনে গভীরভাবে গেঁথে দেয়া হয়।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতা তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। তালেবানের কঠোরতা, প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড, অঙ্গচ্ছেদ এবং সাধারণ মানুষের প্রতি নির্মম আচরণ তাকে প্রশ্ন করতে শেখায়। একই সময়ে আধুনিক শিক্ষার সংস্পর্শে এসে তিনি উপলব্ধি করেন যে বহু ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও প্রচারণা বাস্তবতা এবং বিজ্ঞানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

২০০২ সালে মানবপাচারকারীদের মাধ্যমে তিনি যুক্তরাজ্যে পৌঁছে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেন। শুরুর জীবন ছিল অত্যন্ত কঠিন। আশ্রয়ের আবেদন ঝুলে থাকায় তিনি নানা অস্থায়ী ও স্বল্প আয়ের কাজ করেন। পরবর্তীতে আয়ারল্যান্ডে কিছু সময় কাটিয়ে আবার যুক্তরাজ্যে ফিরে আসেন এবং উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

বর্তমানে তিনি এনএইচএসে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি লেখালেখির মাধ্যমে উগ্রবাদবিরোধী সচেতনতা গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। তাঁর মতে, চরমপন্থা কেবল অস্ত্র দিয়ে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়; মানুষের মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, আধুনিক শিক্ষা এবং স্বাধীনভাবে ভাবার সুযোগ তৈরি করতে হবে।

তিনি বলেন, অনেক শরণার্থী যুদ্ধের ভয়াবহ মানসিক আঘাত নিয়ে নতুন দেশে আসে। কেউ কেউ সেই অভিজ্ঞতা কাটিয়ে সফলভাবে সমাজে একীভূত হতে পারে, আবার বিচ্ছিন্নতা ও হতাশা কিছু মানুষের মধ্যে উগ্রপন্থার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে সব শরণার্থীকে একই দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করা ঠিক নয়।

আফগানিস্তানে তালেবানের পুনরায় ক্ষমতায় ফেরাকে তিনি উদ্বেগের সঙ্গে দেখছেন। তাঁর আশঙ্কা, আধুনিক শিক্ষার পরিবর্তে যদি লক্ষ লক্ষ শিশু কেবল একমুখী ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে ভবিষ্যতে নতুন প্রজন্মের মধ্যে উগ্রবাদ আরও বিস্তার লাভ করতে পারে।

মাইওয়ান্ড বানায়ির মতে, শুধু মানবিক সহায়তা নয়, মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা নিশ্চিত করাও জরুরি। তিনি বিশ্বাস করেন, শিক্ষা, যুক্তিবাদী চিন্তা এবং সমাজে ইতিবাচকভাবে একীভূত হওয়ার সুযোগই দীর্ঘমেয়াদে সহিংস উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।

তার জীবনগাথা দেখিয়ে দেয়, চরমপন্থার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষা, অধ্যবসায় এবং নতুন সুযোগের মাধ্যমে একটি মানুষ কীভাবে সমাজের জন্য ইতিবাচক অবদান রাখা একজন পেশাজীবীতে পরিণত হতে পারেন।

সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ

এম.কে

আরো পড়ুন

বিবিসি চেয়ারম্যানের পদত্যাগ

নিউজ ডেস্ক

যুদ্ধবিরতিতে না এলে সেপ্টেম্বরে প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র স্বীকৃতি দেবে যুক্তরাজ্য

বিপজ্জনক যাত্রা করা শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দিতে অস্বীকৃতি জানাবে যুক্তরাজ্য