TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে রেখে হরমুজে নতুন কৌশল ইরানেরঃ চার দেশের জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা শিথিল

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির বড় ধরনের পরাজয়ের পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে চার দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিশেষ ছাড় দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। ভারত, চীন, ইরাক ও কাতারের জাহাজকে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন দেশটির পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির উপপ্রধান আমির হায়াত-মোগাদ্দাম। পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরানের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্য ও আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

৪ নভেম্বর বুধবার ইরানের এই আইনপ্রণেতা জানান, চার দেশের জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তবে দেশভেদে শর্ত আলাদা রাখা হয়েছে। ভারত ও চীনের বাণিজ্যিক জাহাজকে প্রণালি পারাপারের জন্য নির্ধারিত ট্রানজিট ফি দিতে হবে। অন্যদিকে কাতারের জাহাজের ক্ষেত্রে এই ফি মওকুফের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তেহরান।

ইরাকের পণ্যবাহী ও তেলবাহী জাহাজকেও প্রণালি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে ইরাকি জাহাজের কাছ থেকে ট্রানজিট ফি নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানাননি হায়াত-মোগাদ্দাম। ভারতীয় জাহাজ চলাচলের সুযোগ দেওয়ার পেছনে দেশটি থেকে ওষুধ আমদানির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। অন্যদিকে চীনের ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের রাজনৈতিক সমর্থনের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে বলে জানান এই আইনপ্রণেতা।

হরমুজ প্রণালিতে চলাচলের সুযোগ দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হওয়ায় এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর ইরানের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ভারত ও চীনের মতো বড় জ্বালানি আমদানিকারক দেশের জন্য এই ছাড় গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় পরাজয়ের পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তার বক্তব্য, মার্কিন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের পরিবর্তন কিংবা রাজনৈতিক সমীকরণের রদবদল হলেই যুক্তরাষ্ট্রের ইরাননীতি বদলে যাবে—এমনটা ভাবার কারণ নেই। তিনি ইরানের জনগণকে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে অতিরিক্ত উল্লাস প্রকাশ না করার আহ্বানও জানিয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় মোজতবা খামেনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার ইরানের ওপর হামলা চালায়, তাহলে সংঘাতের পরিধি আরও বিস্তৃত হবে। পশ্চিম এশিয়ার আরও বড় অংশ এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। তার এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, মার্কিন নির্বাচনে ট্রাম্পের দলের পরাজয়কে ইরানের সঙ্গে বিরোধের অবসানের সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে না তেহরান।

অন্যদিকে নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিপর্যয় নিয়ে ইরানের বিভিন্ন সরকারি মহল থেকে বিদ্রূপাত্মক প্রতিক্রিয়া এসেছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থিত ইরানি দূতাবাসের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি পোস্টে বলা হয়েছে, যখনই এবং যেখানে শয়তানকে দেখা যাবে, তাকে টেনে নিচে নামাতে হবে।

ভারতে অবস্থিত ইরানের দূতাবাসও ট্রাম্পকে নিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি একটি ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও প্রকাশ করেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, চার ব্যক্তি মিলে ট্রাম্পকে তুলে ‘বিপজ্জনক বর্জ্য’ লেখা একটি ময়লার পাত্রে ফেলে দিচ্ছেন। ভিডিওটির ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, ‘আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন’। নির্বাচনের ফলাফলকে কেন্দ্র করে ইরানের কূটনৈতিক মহলের এমন বিদ্রূপ দুই দেশের বৈরী সম্পর্কের আরেকটি দিক তুলে ধরেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের খারাপ ফলাফলের পেছনে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রভাব রয়েছে বলে মনে করছেন ট্রাম্প এবং ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। দুই পক্ষের বক্তব্যে এ বিষয়ে মিল পাওয়া গেছে। ট্রাম্পের দলের পরাজয়ের পেছনে যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে এমন মূল্যায়ন ইঙ্গিত দিচ্ছে, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত শুধু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়েছে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়। ফলে এই নৌপথে চলাচলে বাধা সৃষ্টি হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও পণ্যের দামে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। ইরানের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট চার দেশের জন্য আলাদা শর্তে চলাচলের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাই শুধু বাণিজ্যিক নয়, কৌশলগত ও কূটনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।

ট্রাম্পের নির্বাচনি বিপর্যয়ের পর ইরানের এই ঘোষণা এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নতুন করে কঠোর হুঁশিয়ারি পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তবে নির্বাচনের ফলাফলের কারণেই ইরান হরমুজ প্রণালি নিয়ে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এমন কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একইভাবে চার দেশের জাহাজ চলাচলে ছাড়ের ঘোষণাটি একজন ইরানি আইনপ্রণেতার বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত হয়েছে।

সূত্রঃ রয়টার্স\ অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস\আনাদোলু এজেন্সি

এমকে

আরো পড়ুন

নিউইয়র্ক সফরে রাজা চার্লস—কোহিনূর ইস্যুতে বিতর্কঃ মামদানির মন্তব্যে নতুন আলোচনা

আর্জেন্টিনার নতুন প্রেসিডেন্ট কট্টরপন্থী পন্থী জাভিয়ের মিলেই

টাটা গ্রুপের কর্ণধার রতন টাটা মারা গেছেন