13 C
London
September 10, 2026
TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিকআমেরিকা

যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে কানাডার পাল্টা শুল্ক কার্যকরঃ বাণিজ্যযুদ্ধে নতুন উত্তেজনা

যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে চলমান বাণিজ্য সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। মার্কিন পণ্যের ওপর কানাডার নতুন পাল্টা শুল্ক ৮ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, দুগ্ধজাত পণ্য, গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, কৃষি সরঞ্জাম, আসবাবপত্র, পোশাক, কাগজ ও ইলেকট্রনিক পণ্যসহ বিভিন্ন মার্কিন পণ্যে ১৫, ২৫ ও ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানো হয়েছে।

রয়টার্সের হিসাবে, নতুন করে প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের মার্কিন পণ্য এই পাল্টা ব্যবস্থার আওতায় এসেছে। তবে কানাডা সরকারের সরকারি নথিতে নতুন কাউন্টার-ট্যারিফের আওতা ২৭.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের আমদানি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কানাডা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নতুন শুল্কের প্রভাবের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই পণ্যভেদে ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।

কানাডার এই পদক্ষেপ এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের নতুন শুল্কনীতির জবাবে। যুক্তরাষ্ট্র ২২ আগস্ট থেকে কানাডার ২৭.৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করে। এর পর কানাডা ঘোষণা দেয়, মার্কিন পদক্ষেপের সমপরিমাণ অর্থনৈতিক প্রভাব সৃষ্টি করতে তারা পাল্টা ব্যবস্থা নেবে।

নতুন কানাডীয় শুল্কের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম খাত, দুগ্ধপণ্য, গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, কৃষি সরঞ্জাম, পাল্প ও কাগজ, প্লাস্টিক এবং ইলেকট্রনিক পণ্যে। কিছু ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম পণ্যের ক্ষেত্রে আগের ২৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। আসবাবপত্র এবং পোশাকের মতো পণ্যও ৫০ শতাংশ শুল্কের আওতায় এসেছে।

২৫ শতাংশ শুল্কের আওতায় রয়েছে বিভিন্ন গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, পনিরসহ কিছু দুগ্ধজাত পণ্য, মাছ ও সামুদ্রিক খাদ্য এবং ইস্পাত-অ্যালুমিনিয়ামের কিছু তৈরি পণ্য। কানাডার সরকারি তালিকায় পণ্যভেদে শুল্কের হার নির্দিষ্ট করা হয়েছে এবং ৮ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে।

কানাডার অর্থমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া-ফিলিপ শ্যাম্পেনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই পাল্টা শুল্কের প্রধান লক্ষ্য কানাডার শ্রমিক, উৎপাদক ও শিল্পকে মার্কিন পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক চাপ থেকে সুরক্ষা দেওয়া। পাশাপাশি কানাডা সরকার ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা ও কর্মীদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা কর্মসূচিও ঘোষণা করেছে।

শুল্কের অভিঘাত সামলাতে কানাডা সরকার নতুন ও বর্ধিত কর্মসূচি মিলিয়ে ৭.৫ বিলিয়ন কানাডীয় ডলারের সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে আঞ্চলিক শুল্ক প্রতিক্রিয়া উদ্যোগে অতিরিক্ত ১.৫ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার বরাদ্দ রয়েছে। ছোট ও মাঝারি ব্যবসার তারল্য সংকট মোকাবিলায় এই অর্থ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া ব্যবসাগুলোর তাৎক্ষণিক নগদ প্রবাহের চাপ মোকাবিলায় কানাডার বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ‘পিভট টু গ্রো’ কর্মসূচির আওতায় নতুন করে ৫০০ মিলিয়ন কানাডীয় ডলারের তারল্য সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পের জন্য বিদ্যমান বিভিন্ন কর্মসূচির আওতাও বাড়ানো হয়েছে।

তবে এই পাল্টা শুল্ক শুধু অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া নয়, এর পেছনে রাজনৈতিক হিসাবও রয়েছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কানাডা এমন কিছু মার্কিন পণ্যকে লক্ষ্য করেছে যেগুলোর উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে যুক্ত। উইসকনসিন, ওহাইও ও মিশিগানের মতো অঙ্গরাজ্যের শিল্প ও কৃষিপণ্যের ওপর চাপ তৈরির মাধ্যমে ওয়াশিংটনের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করাও কানাডার কৌশলের অংশ বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাণিজ্য বিরোধের এই পর্যায়ে দুই দেশের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বছরে প্রায় ৯০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য হয়। ফলে শুল্কের পাল্টাপাল্টি ব্যবস্থা দীর্ঘায়িত হলে শুধু দুই দেশের ব্যবসা নয়, উত্তর আমেরিকার সরবরাহব্যবস্থা ও ভোক্তা বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

এরই মধ্যে কানাডার পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার দিন যুক্তরাষ্ট্রও নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কানাডার কিছু পণ্যের ওপর আমদানি নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। এর মধ্যে কিছু কানাডীয় দুগ্ধপণ্য, অ্যালকোহল ও মোটরসাইকেল রয়েছে। এসব নিষেধাজ্ঞা ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়ার কথা।

ফলে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ এখন শুধু শুল্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; আমদানি নিষেধাজ্ঞা, সরকারি ক্রয়, শিল্পখাতের ওপর চাপ এবং উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য কাঠামো নিয়েও সংঘাত বাড়ছে। মার্কিন-কানাডা-মেক্সিকো বাণিজ্য চুক্তি বা ইউএসএমসিএর ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই পাল্টাপাল্টি ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে উভয় দেশের ব্যবসার খরচ বাড়তে পারে, সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত কিছু পণ্যের দাম ভোক্তাদের ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সরকার যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপসহ অন্যান্য বাজারের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর কৌশলও জোরদার করছে।

এদিকে ওয়াশিংটনের সর্বশেষ পদক্ষেপের পর বাণিজ্য সংঘাত আরও কতটা বাড়ে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক অংশীদারদের একটি হওয়ায় দুই দেশের এই সংঘাত শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেই নয়, উত্তর আমেরিকার শিল্প, কৃষি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

সূত্রঃ রয়টার্স

এম.কে

আরো পড়ুন

ফকল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে মন্তব্যঃ ব্রিটিশ ডানপন্থীদের তোপের মুখে নেতানিয়াহুর ছেলে

জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব পদে আলোচনায় ড. ইউনূস

স্থুলতাজনিত হৃদরোগের ওষুধ উইগোভিকে ফের ছাড়পত্র ইইউ’র