TV3 BANGLA
বাংলাদেশ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন চুক্তিঃ বাংলাদেশের খাদ্য, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক

নির্বাচনের ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একাধিক বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা-সম্পর্কিত সমঝোতা স্বাক্ষর নিয়ে দেশে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সম্পাদিত এসব চুক্তি ছিল অস্বচ্ছ এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের খাদ্য, জ্বালানি ও সামরিক নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মোহাম্মদ ইউনুস নির্বাচনের দুই দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি রেসিপ্রোকাল ট্রেড এগ্রিমেন্ট (আরটিএ) স্বাক্ষর করেন। সমালোচকদের দাবি, চুক্তিটি জনসমক্ষে প্রকাশ না করেই সম্পাদিত হয়েছে। তবে সরকারপক্ষ বলছে, এটি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণের অংশ।

রাজনৈতিক মহলে আরও আলোচনা তৈরি হয়েছে কারণ বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের টেকনোক্র্যাট কোটায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে খালিলুর রহমানের নিয়োগ এবং চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট হয়নি। বিএনপি-ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

চুক্তির আওতায় আগামী ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ এলএনজি ও কৃষিপণ্য আমদানির সম্ভাবনার কথা আলোচনায় এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদি বছরে নির্দিষ্ট পরিমাণ আমদানি বাধ্যতামূলক হয়, তাহলে দেশীয় কৃষক ও জ্বালানি খাতে প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে সমর্থকরা বলছেন, স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ শিল্পখাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তৈরি পোশাক খাতে যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব আলোচনায় থাকলেও, এর সঙ্গে বাণিজ্য ভারসাম্য রক্ষার শর্ত যুক্ত থাকতে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন। বিশেষ করে যদি কাঁচামাল যুক্তরাষ্ট্র থেকেই সংগ্রহের বাধ্যবাধকতা থাকে, তাহলে ভারত, চীন বা অন্যান্য উৎস থেকে কম দামে আমদানির সুযোগ সীমিত হতে পারে।

প্রতিরক্ষা খাতেও আলোচনায় এসেছে জিএসওএমআইএ (GSOMIA) ও এসিএসএ (ACSA) চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-কে পাঠানো এক চিঠিতে এসব চুক্তি দ্রুত সম্পন্নের আহ্বান জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। যদিও চিঠির বিষয়বস্তু আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর ইঙ্গিত স্পষ্ট।

সমালোচকদের মতে, প্রতিরক্ষা চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের সামরিক ক্রয়নীতি ও কৌশলগত অংশীদারিত্বে পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়লে চীন, ভারত বা রাশিয়ার সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা একটি বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

কৃষি খাতে পেটেন্টকৃত জিএম বীজ আমদানির সম্ভাবনা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন এতে দেশীয় বীজ বৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, আবার অন্যরা বলছেন প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব।

ফার্মাসিউটিক্যাল ও টেক্সটাইল খাতেও সম্ভাব্য শর্ত নিয়ে আলোচনা চলছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ক্ষেত্রে এফডিএ অনুমোদন, কাঁচামাল উৎস এবং শুল্ক কাঠামো নিয়ে শিল্পমহল পরিষ্কার ব্যাখ্যা চেয়েছে।

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগকে কেউ দেখছেন অর্থনৈতিক সুযোগ হিসেবে, আবার কেউ দেখছেন কৌশলগত ঝুঁকি হিসেবে। সরকার এখনো পূর্ণাঙ্গ চুক্তিপত্র প্রকাশ না করায় বিতর্ক আরও তীব্র হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, স্বচ্ছতা, সংসদীয় পর্যালোচনা এবং জাতীয় ঐকমত্য ছাড়া এমন দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি বাস্তবায়ন হলে তা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে।

সূত্রঃ নর্থইস্ট নিউজ

এম.কে

আরো পড়ুন

বাংলাদেশে ধানের তুষ থেকে উৎপাদিত হচ্ছে ভোজ্য তেল

অভ্যুত্থানকালের প্রাণহানি তদন্তে শিগগির আসছে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ দল

যুক্তরাজ্যে শীতকালীন সহায়তা পেতে ব্যর্থ হতে যাচ্ছেন ৯ লাখের বেশি পেনশনার