যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা অত্যন্ত কম হলেও এমন পরিস্থিতির আশঙ্কাকে আর পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছে না কানাডা। সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে দেশটির সরকার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নিচ্ছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাকে তিনি চরম ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, এমন পরিস্থিতি বাস্তবে ঘটার সম্ভাবনা খুবই কম। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সবচেয়ে অস্বাভাবিক সম্ভাবনাও বিবেচনায় রাখতে হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সম্পর্কের অবনতিই অটোয়ার নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ট্রাম্প একাধিকবার কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার কথা বলেছেন। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে শুল্ক ও বাণিজ্য বিরোধও সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে।
এই পরিস্থিতিতে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে। প্রযুক্তি, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এবং কৌশলগত সরবরাহ ব্যবস্থায় বিকল্প অংশীদার খুঁজছে অটোয়া। একই সঙ্গে দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যয়ও বাড়ানো হচ্ছে।
কানাডার সামরিক বাহিনীর একটি সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতির মডেল নিয়েও আলোচনা সামনে এসেছে। সেই মডেল অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র কখনো কানাডায় সামরিক হামলা চালালে যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে কানাডার গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানগুলো দ্রুত হুমকির মুখে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের সামরিক সক্ষমতার বিশাল পার্থক্যের কারণে প্রচলিত যুদ্ধে কানাডার জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ গড়ে তুলতে কানাডা ভিন্ন ধরনের যুদ্ধকৌশল গ্রহণ করতে পারে। এর মধ্যে গেরিলা ধাঁচের প্রতিরোধ এবং যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো মিত্র দেশগুলোর সহায়তা চাওয়ার বিষয়ও আলোচনায় এসেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও কানাডার বিরুদ্ধে যুদ্ধ সহজ হবে না বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। দুই দেশের দীর্ঘ সীমান্ত, ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক ও জনমতের প্রতিক্রিয়া এমন সংঘাতকে অত্যন্ত জটিল করে তুলতে পারে।
সম্ভাব্য সংঘাত সরাসরি সামরিক হামলা দিয়ে শুরু নাও হতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। সাইবার হামলা, অর্থনৈতিক চাপ কিংবা অন্যান্য অপ্রচলিত পদ্ধতির মাধ্যমে সংঘাতের সূচনা হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে কানাডা তার সামরিক বাহিনীর আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। দেশটির নাগরিকদের মধ্য থেকে প্রায় তিন লাখ মানুষকে তুলনামূলক স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যুক্ত করার পরিকল্পনাও আলোচনায় রয়েছে।
তবে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন অর্থে যে শিগগিরই যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে, তা নয়। বরং সম্ভাবনা অত্যন্ত কম হলেও ভবিষ্যতে অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি তৈরি হলে যাতে দেশটি প্রস্তুত থাকে, সেই লক্ষ্যেই প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একসময় ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা হওয়াই বদলে যাওয়া বৈশ্বিক ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
সূত্রঃ বিবিসি \ দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
এমকে

