যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় বিজয়ের পর দেশটির প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত আবদুল রহমান মোহাম্মদ এল-সাইয়েদের আরবি ভাষায় দেওয়া বিজয় ভাষণ ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তার বিজয় এবং বক্তব্যের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক লি কোহেন। তার আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রের মতো ব্রিটেনেও ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পরিচয় ও নির্বাচনী বক্তব্যে আন্তর্জাতিক সংঘাত এবং ধর্মীয় বিষয় আরও বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।
জিবি নিউজে প্রকাশিত মতামতধর্মী নিবন্ধে লি কোহেন লিখেছেন, মঙ্গলবারের নির্বাচন ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থকদের জন্য হতাশাজনক রাত। নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষে বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন করেছে। বুধবার পর্যন্ত সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের আসন দাঁড়ায় ৫৪টিতে, যার মধ্যে তাদের সঙ্গে থাকা দুজন স্বতন্ত্র সদস্যও রয়েছেন। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের আসন ছিল ৪৪টি। আলাস্কা ও মিসিসিপির ফল তখনো চূড়ান্ত হয়নি। প্রতিনিধি পরিষদেও ডেমোক্র্যাটরা দুই ডজনের বেশি আসন পেয়েছে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয়েছে মিশিগান অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনের ফল নিয়ে। সেখানে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে প্রায় সাত শতাংশ ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন আবদুল রহমান মোহাম্মদ এল-সাইয়েদ। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হওয়ার নজির গড়েছেন তিনি।
বিজয় ভাষণে নিজের নাম উল্লেখ করে এল-সাইয়েদ বলেন, বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে তিনি সবসময় ‘ইনশাআল্লাহ’ বলতেন। তবে এবার সেই শব্দের পরিবর্তে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলার সময় এসেছে। তার বক্তব্যের এই অংশে আরবি শব্দ ব্যবহারের বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন লি কোহেন।
তবে নিবন্ধের লেখক বলেছেন, ধর্মীয় অভিব্যক্তি নয়, বরং এল-সাইয়েদের রাজনৈতিক বক্তব্যই তার কাছে বেশি উদ্বেগের বিষয়। বিজয় ভাষণে তিনি বলেন, করদাতাদের অর্থ বর্ণবাদী নিপীড়ন, গণহত্যা কিংবা যুদ্ধে ব্যয় হোক, তারা তা চান না। গাজা যুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে তার এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
নির্বাচনের পর স্কাই নিউজের মার্কিন সংবাদদাতা জেমস ম্যাথিউজ তাকে প্রশ্ন করতে গেলে এল-সাইয়েদ জানতে চান, ওই সাংবাদিক মিশিগানের নিবন্ধিত ভোটার কি না। সাংবাদিক ভোটার নন জানার পর তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যে তিনি একটিও ভোট পেতে চান না। পরে তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা কী ভাবছেন, তা নিয়ে আমি আসলে একেবারেই চিন্তিত নই।’
এ ঘটনায় সাংবাদিকের সঙ্গে তার আচরণের সমালোচনা করেছেন ব্রিটিশ উপস্থাপক পিয়ার্স মরগান। তিনি একে অসম্মানজনক ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ বলে মন্তব্য করেছেন।
লি কোহেন তার নিবন্ধে ব্রিটেনের সাম্প্রতিক রাজনীতির সঙ্গেও এই ঘটনার তুলনা করেছেন। ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি রচডেল উপনির্বাচনে ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা জর্জ গ্যালওয়ে ১২ হাজার ৩৩৫ ভোট পেয়ে জয়ী হন। বিজয় ভাষণে তিনি গাজা যুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে বক্তব্য দেন।
এর চার মাস পর সাধারণ নির্বাচনে লেস্টার সাউথ আসনে জয়ী হন শওকত আদম। তিনি তৎকালীন লেবার পার্টির এমপি জনাথন অ্যাশওয়ার্থকে মাত্র ৯৭৯ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। বিজয় ভাষণেও গাজার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন তিনি। একই নির্বাচনে ব্ল্যাকবার্ন, বার্মিংহাম পেরি বার এবং ডিউসবারি অ্যান্ড ব্যাটলিতে গাজা যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নিয়ে প্রচার চালানো স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও জয়ী হন।
নিবন্ধে বিবিসির একটি বিশ্লেষণের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, মুসলিম জনসংখ্যা অন্তত ২০ শতাংশ এমন এলাকায় লেবার পার্টির ভোটের হার গড়ে ২৩ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে। ‘দ্য মুসলিম ভোট’ নামের প্রচারাভিযানও গাজা ইস্যুতে সরকারের অবস্থানের বিরোধিতাকারী প্রার্থীদের সমর্থন দিয়েছিল।
ব্রিটেনে ধর্মীয় অনুভূতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন লেখক। ২০২১ সালে ব্যাটলির একটি স্কুলে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে কার্টুন প্রদর্শনের পর এক শিক্ষককে নিরাপত্তার কারণে আত্মগোপনে যেতে হয়েছিল। এ ছাড়া কোরআন পোড়ানোর ঘটনায় অভিযুক্ত হামিত কসকুনকে প্রথমে ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক বিশৃঙ্খল আচরণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হলেও পরে আপিল আদালত তাকে খালাস দেন। আদালত বলেন, ব্রিটিশ আইনে ধর্ম অবমাননার কোনো অপরাধ নেই।
লি কোহেনের আশঙ্কা, বিদেশের সংঘাত ও ধর্মীয় অনুভূতিকে কেন্দ্র করে ব্রিটেনের রাজনীতিতে এমন পরিবর্তন ঘটতে পারে, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর প্রভাব ফেলবে।
অন্যদিকে লন্ডনের মেয়র সাদিক খান ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী বিজয়কে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভাজনমূলক রাজনীতির বিরুদ্ধে জনগণের বড় প্রত্যাখ্যান। তবে এল-সাইয়েদের বিজয় নিয়ে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি।
নিবন্ধের শেষাংশে লি কোহেন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের রাজনীতিতে জনগণের দৈনন্দিন সমস্যা—জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আয়—প্রাধান্য পাওয়া উচিত। তার মতে, নির্বাচনী বিজয় ভাষণে বিদেশের যুদ্ধের পরিবর্তে নিজ দেশের স্বার্থ ও মানুষের সমস্যাই গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।
সূত্রঃ জিবি নিউজ
এমকে

