লন্ডনের সাউথফিল্ডসে অবস্থিত ফজল মসজিদ প্রতিষ্ঠার ১০০ বছর পূর্ণ করেছে। ১৯২৬ সালের ৩ অক্টোবর উদ্বোধন হওয়া এই মসজিদকে লন্ডনের প্রথম উদ্দেশ্যনির্মিত মসজিদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। শতবর্ষ উপলক্ষে দোয়া, বিভিন্ন সামাজিক সেবামূলক কার্যক্রম, গৃহহীনদের জন্য ১০ হাজার খাবার বিতরণ এবং যুক্তরাজ্যজুড়ে মানুষের সহায়তায় ১০ হাজার স্বেচ্ছাসেবী ঘণ্টা দেওয়ার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
মসজিদটির নির্মাণ প্রকল্পের অর্থের বড় অংশ এসেছিল তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের আহমদিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যদের অনুদান থেকে। তাদের অনেকেই কখনো ব্রিটেনে আসেননি কিংবা নিজেদের অর্থে নির্মিত মসজিদটি দেখার সুযোগও পাননি। তাদের মধ্যে নারীরাও ছিলেন, যারা মসজিদ নির্মাণে সহায়তার জন্য নিজেদের গয়না ও মূল্যবান সামগ্রী বিক্রি করে অর্থ দিয়েছিলেন।
১৯২৬ সালের ৩ অক্টোবর মসজিদটির উদ্বোধনে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ সাউথফিল্ডসে জড়ো হন। সংসদ সদস্য, ধর্মীয় নেতা, কূটনীতিক, স্থানীয় প্রতিনিধি এবং ব্রিটেনের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মুসলিমরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন। ল্যাঙ্কাশায়ারে জন্ম নেওয়া স্থপতি থমাস হেটন মসন মসজিদটির নকশা করেন। এতে ভারতীয় উপমহাদেশের স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে লন্ডনের আবাসিক এলাকার বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফজল মসজিদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আহমদিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের বর্তমানে যুক্তরাজ্যজুড়ে ১৫০টির বেশি শাখা রয়েছে। গত এক শতাব্দীতে মসজিদটি বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গেও যুক্ত ছিল।
১৯৩৩ সালে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ মসজিদটিতে ফিরে এসে বক্তব্য দেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লন্ডনে ব্যাপক বোমা হামলার মধ্যে মসজিদটি আশ্রয় ও নিরাপত্তার স্থান হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
১৯৮৪ সালে পাকিস্তানে ধর্মীয় নিপীড়নের পর আহমদিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের চতুর্থ খলিফা মির্জা তাহের আহমদ ব্রিটেনে আসেন এবং ফজল মসজিদকে বিশ্বব্যাপী আহমদিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের আন্তর্জাতিক সদর দপ্তর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। সেখান থেকে তিনি মুসলিম টেলিভিশন আহমদিয়া ইন্টারন্যাশনাল চালু করেন এবং বসনিয়া যুদ্ধের সময় মানবিক সহায়তা সংস্থা হিউম্যানিটি ফার্স্ট প্রতিষ্ঠা করেন।
২০০৩ সালে মির্জা মাসরুর আহমদকে মসজিদটিতে আহমদিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের পঞ্চম খলিফা ও বর্তমান বিশ্বনেতা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।
২০১৮ সালে ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় মসজিদটি হিস্টোরিক ইংল্যান্ডের তালিকাভুক্ত স্থাপনার মর্যাদা পায়। চলতি বছর ওয়ান্ডসওয়ার্থ কাউন্সিল মসজিদটিকে একটি সবুজ ঐতিহ্য ফলকও দিয়েছে।
শতবর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচির মূল প্রতিপাদ্য রাখা হয়েছে—‘শান্তির আলোকবর্তিকা: এক শতাব্দীর একীভূতকরণ, আনুগত্য ও সেবা’। আয়োজকেরা শুধু মসজিদের ইতিহাস তুলে ধরার পরিবর্তে সামাজিক সেবার মাধ্যমে শতবর্ষ উদযাপনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। এ উপলক্ষে মসজিদের ইতিহাস নিয়ে একটি স্থায়ী প্রদর্শনীও চালু করা হবে।
এ ছাড়া লন্ডনের ১০০টি বাসে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ব্রিটিশ সমাজে মসজিদটির এক শতাব্দীর অবদানের কথা তুলে ধরার একটি দেশব্যাপী প্রচারাভিযান চালু করা হবে।
আহমদিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের যুক্তরাজ্যের জাতীয় সভাপতি রফিক হায়াত বলেন, তাদের সদস্যরা ব্রিটেনে স্বাগত পেয়েছিলেন এবং সেই স্বাগত তারা কখনো ভুলে যাননি। তিনি বলেন, এই শতবর্ষ ব্রিটেনেরও, কারণ তারা অতিথি হিসেবে নয়, বরং দেশের উন্নতি ও সমৃদ্ধিতে অবদান রাখতে আগ্রহী নাগরিক হিসেবে এখানে রয়েছেন।
আহমদিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের বর্তমান বিশ্বনেতা মির্জা মাসরুর আহমদ বলেন, ফজল মসজিদ এমন মানুষের ত্যাগের মাধ্যমে নির্মিত হয়েছিল, যারা তাদের সামান্য সম্পদও এমন একটি স্থানের জন্য দিয়েছিলেন, যেটি তারা নিজেরা হয়তো কখনো দেখতে পাবেন না। শতবর্ষ উপলক্ষে শান্তির জন্য দোয়া এবং প্রতিবেশী ও প্রয়োজনগ্রস্ত মানুষের সহায়তার মাধ্যমে সময় দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সূত্রঃ এশিয়ান ইমেজ
এমকে

