সিলেটে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতকে কেন্দ্র করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের উপস্থিতিতে সাংবাদিকদের হেনস্তা ও ধাক্কাধাক্কির অভিযোগ উঠেছে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় অন্তত নয়জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনার প্রতিবাদে সিলেটে কর্মরত টেলিভিশন সাংবাদিকরা পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর অনুষ্ঠানসহ বিএনপির সব ধরনের কর্মসূচির সংবাদ সংগ্রহ বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন।
শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো সিলেটে গিয়ে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন হুমায়ুন কবির। পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী, মাজার জিয়ারত শেষে তার গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার কথা ছিল। এ কারণে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা মাজারের মূল ফটকের সামনে অবস্থান নেন।
সাংবাদিকদের অভিযোগ, প্রতিমন্ত্রী মাজার থেকে বের হওয়ার সময় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ব্যাপক ভিড় ও ধাক্কাধাক্কিতে স্বাভাবিকভাবে সংবাদ সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছিল না। পরিস্থিতির কারণে সাংবাদিকরা মাজারের বাইরে চলে আসেন। তখন একদল নেতাকর্মী ‘জিয়ার সৈনিক, এক হও’ স্লোগান দিয়ে সাংবাদিকদের দিকে এগিয়ে এসে মারমুখী আচরণ করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
এই ঘটনায় আহত গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে রয়েছেন সময় টেলিভিশনের প্রতিবেদক অপু বণিক, যমুনা টেলিভিশনের প্রতিবেদক নাবিল হোসেন, চ্যানেল ওয়ানের প্রতিবেদক এম এ কাইয়ুম, ডিবিসি নিউজের তাওহিদুর রহমান শাহ, স্টার টেলিভিশনের ব্যুরো প্রধান ইয়াহ্ইয়া মারুফ, কালের কণ্ঠ মাল্টিমিডিয়ার সিলেট ব্যুরো ইনচার্জ কবির আহমদ, একাত্তর টেলিভিশনের ক্যামেরাপারসন তারেক আহমদ, ডিবিসির ক্যামেরাপারসন সাকিব আহমদ এবং এটিএন নিউজের প্রতিবেদক কামরুল ইসলাম মাহি।
ঘটনার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে সাংবাদিকরা জানান, প্রতিমন্ত্রী গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার আগেই নেতাকর্মীদের অতিরিক্ত চাপ ও ধাক্কাধাক্কির কারণে তারা মাজারের বাইরে চলে আসেন। এরপর কয়েকজন তাদের দিকে চড়াও হন। কারও কারও ক্যামেরা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন সাংবাদিকরা।
এ ঘটনায় সাংবাদিকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর হেনস্তার শিকার হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে একজন দায়িত্বশীল সরকারি প্রতিনিধির কর্মসূচিতে তার উপস্থিতির মধ্যেই এমন ঘটনা ঘটার অভিযোগ আরও উদ্বেগজনক।
ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে সিলেটের স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে আরও একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে—কারা ওই হামলা বা হেনস্তায় জড়িত ছিলেন এবং তাদের রাজনৈতিক পরিচয় কী। স্থানীয় পর্যায়ে আবদুল কাদির সমসু-পন্থী হিসেবে পরিচিত কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে বলে আলোচনা থাকলেও, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রত্যেকের ভূমিকা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। তাই এ অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জোরালো হয়েছে।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক মহলের একটি অংশের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের রাজনৈতিক বলয় গঠন নিয়েও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। সমালোচকদের অভিযোগ, স্থানীয়ভাবে নিজের রাজনৈতিক শক্তি ও প্রভাব বাড়াতে তিনি বিভিন্ন বিতর্কিত নেতাকর্মীকে আশপাশে জায়গা দিচ্ছেন।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে হুমায়ুন কবিরের সাম্প্রতিক বক্তব্যের সঙ্গে এই ঘটনার বৈপরীত্য। এর আগে সিলেটে এক সাংবাদিক সমাবেশে তিনি সাংবাদিকতাকে রাজনৈতিক আনুগত্যের হাতিয়ার না বানিয়ে তথ্য যাচাই করে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে সাংবাদিকদের আপসহীন থাকার কথাও বলেছিলেন।
অন্যদিকে, সাংবাদিকদের অভিযোগ অনুযায়ী তার কর্মসূচিতে যদি গণমাধ্যমকর্মীদেরই নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে হয়, তাহলে সেই নিরাপত্তার দায় কে নেবে—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
ঘটনার পর সিলেটের সাংবাদিকরা স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। নিরাপদ ও স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পরবর্তী কর্মসূচি এবং স্থানীয় বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচির সংবাদ সংগ্রহ থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিএনপির পক্ষ থেকেও ঘটনাটি তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। দলের কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী জানিয়েছেন, কারা সাংবাদিকদের সঙ্গে এমন আচরণ করেছে তা খুঁজে বের করে প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এখন সাংবাদিকদের প্রধান দাবি—ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, আহত সাংবাদিকদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ, জড়িতদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
সিলেটের শাহজালালের মাজারে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা তাই শুধু সাংবাদিক হেনস্তার অভিযোগ নয়; এটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দলীয় নেতাকর্মীদের আচরণ, দলীয় শৃঙ্খলা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন সামনে এনেছে।
সূত্রঃ ঢাকা পোস্ট\আজকের পত্রিকা

