লন্ডনে বিলিয়নিয়ার বাড়িওয়ালা আসিফ আজিজের মালিকানাধীন রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান ক্রাইটেরিয়ন ক্যাপিটালের বিরুদ্ধে সেকশন ২১ ‘নো ফল্ট’ নোটিশ ব্যবহার করে গণউচ্ছেদের অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন লন্ডনের মেয়র সাদিক খান, যিনি কোম্পানির কাছে জরুরি ভিত্তিতে ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, ক্রাইটেরিয়ন ক্যাপিটালের মালিকানাধীন বিভিন্ন ভবনের ব্যক্তিগত ভাড়াটিয়াদের কোনো কারণ উল্লেখ না করেই উচ্ছেদ নোটিশ দেওয়া হয়েছে। সেকশন ২১ নোটিশের মাধ্যমে বাড়িওয়ালারা দুই মাসের নোটিশে ভাড়াটিয়াকে উচ্ছেদ করতে পারেন, কারণ দেখানোর বাধ্যবাধকতা ছাড়াই। এই বিধান আগামী ১ মে ২০২৬ থেকে লেবার সরকারের ‘রেন্টার্স রাইটস অ্যাক্ট’-এর অধীনে ইংল্যান্ডে নিষিদ্ধ হতে যাচ্ছে।
প্রভাবিত ভবনগুলোর মধ্যে রয়েছে কলিয়ার্স উড এলাকার ব্রিটানিয়া পয়েন্ট, ক্রয়ডনের ডেল্টা পয়েন্ট এবং নিউ মালডেনের এমেরাল্ড হাউস। তিনটি ভবনে মিলিয়ে মোট ৬০৬টি ফ্ল্যাট রয়েছে। স্থানীয় সূত্র বলছে, গত জানুয়ারি থেকেই বহু বাসিন্দাকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
লেস্টার স্কয়ারের ট্রোকাডেও ভবনেরও মালিক ক্রাইটেরিয়ন ক্যাপিটাল দাবি করেছে—“শত শত” বাসিন্দাকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ সঠিক নয়। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সীমিত সংখ্যক নোটিশ আইনসম্মতভাবে দেওয়া হয়েছে এবং এটি একটি নিয়মিত সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার অংশ। তবে ঠিক কতজনকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তারা নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করেনি।
মেয়রের দপ্তরের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, সাদিক খান এসব প্রতিবেদনে “ক্ষুব্ধ” এবং কোম্পানির কাছে তাদের পদক্ষেপের ব্যাখ্যা চেয়েছেন। তিনি বলেন, “যথাযথ কারণ ছাড়া লন্ডনবাসীকে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা অগ্রহণযোগ্য। এতে পরিবারগুলো ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়ে।”
লন্ডনের আবাসন বিষয়ক ডেপুটি মেয়র টম কপলি আগেই ব্যাখ্যা চেয়ে যোগাযোগ করেছিলেন। পরবর্তীতে সরাসরি আসিফ আজিজকে লেখা চিঠিতে সাদিক খান উল্লেখ করেন, বাসিন্দাদের নিরাপত্তা ও আবাসন স্থিতিশীলতা নিয়ে কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
আবাসন দাতব্য সংস্থা শেল্টার সেকশন ২১ নোটিশকে গৃহহীনতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাদের মতে, এ ধরনের নোটিশ ভাড়াটিয়াদের খুব অল্প সময়ের মধ্যে নতুন বাসা খুঁজতে বাধ্য করে এবং অনেক ক্ষেত্রে তা হঠাৎ করেই আসে।
মার্টন কাউন্সিলর স্টুয়ার্ট নিভারসন অভিযোগ করেছেন, এটি সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে লন্ডনের সবচেয়ে বড় গণউচ্ছেদ হতে পারে। তার ভাষায়, “কলিয়ার্স উড কমিউনিটি ক্ষুব্ধ। শতাধিক বাসিন্দা বৈঠকে অংশ নিয়ে স্পষ্ট জানিয়েছেন—তারা চুপচাপ বাড়ি ছাড়বেন না।”
নিউ মালডেনের এমেরাল্ড হাউসের এক বাসিন্দা ক্লেয়ার বলেন, নোটিশ পাওয়ার পর তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। গত এক বছরে ফ্ল্যাট সাজিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাসের পরিকল্পনা করেছিলেন, কিন্তু এখন কয়েক মাসের মধ্যে চলে যাওয়ার অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। তার আশঙ্কা, সময়মতো নতুন বাসা না পেলে তাকে পরিবারের কাছে ফিরে যেতে হতে পারে, যা তার কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনে প্রভাব ফেলবে।
ক্রাইটেরিয়ন ক্যাপিটালের মুখপাত্র দাবি করেছেন, বিষয়টি “ভুলভাবে উপস্থাপিত ও রাজনৈতিকীকরণ” করা হয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, মোট ভাড়াটিয়ার পাঁচ শতাংশেরও কম নোটিশ পেয়েছেন এবং অধিকাংশ বাসিন্দা এতে প্রভাবিত হননি। তারা আরও বলেছে, নিয়মিত ভাড়ার চুক্তির আইনি সমাপ্তি গৃহহীনতার সমার্থক নয় এবং এসব ভাড়াটিয়া বিকল্প বেসরকারি ভাড়া খাতে বাসস্থানের সুযোগ পাবেন।
মিচাম অ্যান্ড মরডেন এলাকার লেবার এমপি ডেম সিওভেইন ম্যাকডোনাগ জানিয়েছেন, ব্রিটানিয়া পয়েন্টের বহু বাসিন্দা গৃহহীনতার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন—এ নিয়ে তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
উল্লেখ্য, আসিফ আজিজের পরিবারের দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘দ্য আজিজ ফাউন্ডেশন’ ২০২৩ সাল থেকে লন্ডনের আনুষ্ঠানিক রমজান লাইট উদ্বোধনে পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে, যা সর্বশেষ ১৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়। তবে আবাসন সংকট ও উচ্ছেদ বিতর্কের মধ্যে এ সম্পর্কও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সব মিলিয়ে, সেকশন ২১ নিষিদ্ধ হওয়ার আগে উচ্ছেদ নোটিশ জারি নিয়ে লন্ডনে নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মেয়র স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, স্থিতিশীল ও নিরাপদ বাসস্থান প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার, এবং ‘নো ফল্ট’ উচ্ছেদের গণহারে ব্যবহার তিনি সমর্থন করেন না।
সূত্রঃ দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট
এম.কে

