9.1 C
London
February 4, 2026
TV3 BANGLA
বাংলাদেশ

সেফ এক্সিটের আলামতঃ লাল পাসপোর্ট ছাড়ছেন উপদেষ্টারা

মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নিজেদের কূটনৈতিক (লাল) পাসপোর্ট জমা দিচ্ছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টারা। অর্থ, স্বরাষ্ট্র ও তথ্য, প্রাথমিক ও গণশিক্ষাসহ গুরুত্বপূর্ণ সাত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টারা ইতোমধ্যে তাদের বিশেষ পাসপোর্ট সমর্পণ করে সাধারণ পাসপোর্টের আবেদন জানিয়েছেন।

 

এ তালিকায় প্রধান উপদেষ্টার দু’জন বিশেষ সহকারী, পুলিশের মহাপরিদর্শক, সচিব এবং বিচারপতিও আছেন। বিষয়টি নিয়ে উপদেষ্টাদের স্ব স্ব মন্ত্রণালয়ে ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চলছে কানাঘুষা। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন এটাকে ‘অস্বাভাবিক’ বলে অভিহিত করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচনকালীন সংবেদনশীল বাস্তবতায় বিতর্ক এড়ানো, ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় ভ্রমণ আলাদা রাখা, কিংবা ভবিষ্যৎ ভিসা জটিলতা কমানোর লক্ষ্যেই কেউ কেউ আগেভাগে পাসপোর্ট জমা দিচ্ছেন। তবে কেউ কেউ মনে করছেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে উপদেষ্টারা ‘সেফ এক্সিট’ নিশ্চিত করার জন্য তাদের কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিচ্ছেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, মূলত দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর সাধারণ পাসপোর্ট পেতে দীর্ঘসূত্রতা এবং ইমিগ্রেশনে অনাপত্তি সনদ (এনওসি) সংক্রান্ত আইনি জটিলতা এড়াতেই এই পদক্ষেপ। পদের মেয়াদ থাকাকালীন আবেদন করলে দ্রুত পাসপোর্ট পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকায় তারা এই কৌশল অবলম্বন করছেন। সমালোচকদের মতে, উপদেষ্টাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের কোনো দেশের নাগরিক। নির্বাচনের পরে দায় এড়ানো বা দুর্নীতির অভিযোগ থেকে নিজেকে আড়াল করতেই আগাম সতর্কতামূলক সাধারণ পাসপোর্ট পেতে আবেদন করছেন।

এদিকে, নিজের পাসপোর্ট জমা দেওয়া নিয়ে ছড়িয়ে পড়া গুঞ্জন নাকচ করে দিয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। গত রোববার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আমি বা আমার স্ত্রী কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিইনি। আমার পাসপোর্ট এখনও আমার কাছে আছে এবং ওটা বহাল আছে। এটা খুবই অস্বাভাবিক; যে উপদেষ্টা বা মন্ত্রী তার মেয়াদ থাকাকালে কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দেবেন! আমি এটা করিনি।

তিনি বলেন, তবে কেউ কেউ হয়তো করছেন, কারণ দায়িত্ব শেষে তাদের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন থাকতে পারে। আগেভাগে আবেদন করে রাখলে পাসপোর্ট ও ভিসা সংক্রান্ত প্রক্রিয়াগুলো সহজ হয়-মন্তব্য করেন তিনি। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ব্যাপারটা হলো, একটু সময় গেইন করা, যাতে তাদের পাসপোর্টটাও হয়ে গেল; যেমন যুক্তরাষ্ট্রের বি-ওয়ান, বি-টু ভিসা; সেটা কিন্তু বাতিল হয় না পাসপোর্ট বাতিল হলেও। কিন্তু তাদের তো নতুন পাসপোর্ট নিয়ে যেতে হবে। যদি যেতে হয়, আর কি!

পররাষ্ট্র উপদেষ্টার এই কথায় সন্দেহ পোষণ করেছেন অনেকেই। তারা বলছেন, উপদেষ্টাদের কেউ কেউ ‘সেফ এক্সিট’ নেয়ার জন্যই এমনটা করেছেন বা করছেন। কারণ হিসাবে তারা বলেছেন, উপদেষ্টাদের মধ্যে কয়েকজনের দ্বৈত নাগরিকত্ব আছে। তারা ইচ্ছা করলেই সেই দেশে চলে যেতে পারবেন-যা লাল পাসপোর্ট নিয়ে সম্ভব নয়। উল্লেখ্য, ই-পাসপোর্ট চালু হওয়ার পর থেকে কূটনৈতিক পাসপোর্টের মেয়াদ পাঁচ বছর করা হয়েছে। তবে, পদের মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এই পাসপোর্টের কার্যকারিতা বিশেষ নিয়মের অধীনে চলে আসে অর্থাৎ দায়িত্ব শেষে পাসপোর্ট হস্তান্তর করতে হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, ইতোমধ্যে কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়ে সাধারণ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, তথ্য ও সম্প্রচার এবং পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, গৃহায়ন ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার। তালিকায় আরও রয়েছেন- প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) ও পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম। এছাড়া, সরকারের পূর্ণাঙ্গ সচিব ও হাইকোর্টের কয়েকজন বিচারকও তাদের লাল পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন।

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, কূটনৈতিক পাসপোর্টের মেয়াদ থাকে পাঁচ বছর। তবে, পদত্যাগ বা দায়িত্ব পালন শেষ হওয়ার পর এই পাসপোর্ট হস্তান্তর করা বাধ্যতামূলক। এ বিষয়ে সরকারের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, দুই দিন আগে হোক বা পরে, এটা তাদের ছাড়তে হবে। নিয়ম অনুযায়ী, যে বা যারা কূটনৈতিক পাসপোর্ট পেয়েছেন, দায়িত্ব শেষ হলেই তাদের সেটা হস্তান্তর করতে হবে। তবে, এটা হস্তান্তর করার নির্দিষ্ট কোনো সময় বেঁধে দেওয়া নেই। এখন যারা উপদেষ্টা আছেন তিনি আজ পাঠালে কালই তার পাসপোর্ট হয়ে যাবে। কিন্তু উনি যখন উপদেষ্টা থাকবেন না, তখন কিন্তু আর গ্যারান্টি নেই। পাসপোর্ট অফিস তাকে কত দিনে পাসপোর্ট দেবে, সেটা কিন্তু বড় একটা বিষয়!

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ১২ তারিখের (ফেব্রুয়ারি) পর উনারা যখন আর দায়িত্বে থাকবেন না, তখন এয়ারপোর্ট ট্রাভেল করতে গেলে ইমিগ্রেশন এনওসি (অনাপত্তি সনদ) চাইবে। এনওসি না হলে তো অফিসিয়াল পাসপোর্টে যেতে পারবেন না। এ কারণে উনারা প্রাইভেট পাসপোর্ট করছেন। দায়িত্ব ছাড়ার পরপরই উনাদের কারও কারও কোনো না কোনো দেশে যাওয়া লাগতে পারে। যারা মনে করছেন শিগগিরই তাদের ভ্রমণ করতে হতে পারে, তারা কূটনৈতিক পাসপোর্ট ছাড়ছেন। প্রশ্ন উঠেছে, নতুন সরকার গঠিত হওয়ার আগে কেন তারা কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিচ্ছেন? অনেকেই মনে করছেন, এটা সেফ এক্সিট-এর জন্যই। কারণ নির্বাচনের পরে দেশের অবস্থা কী হয়- তা কারো জানা নেই। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, তা থেকে নিজেকে রক্ষার জন্যই তারা এই কাজটি করেছেন বা করছেন।

সমালোচকদের মতে, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে লাল পাসপোর্ট জমা দেয়া সিদ্ধান্তের সময়টাই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এর নেপথ্যে রয়েছে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তনের আলোচনা, উপদেষ্টা পরিষদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ধোঁয়াশা, নিজেদের দুর্নীতি আড়াল করা। এই প্রেক্ষাপটে হঠাৎ লাল পাসপোর্ট জমা দেওয়াকে তারা দেখছেন আগাম দায়মুক্তির কৌশল হিসেবে। এক বিরোধী রাজনৈতিক নেতা বলেন, যদি শুরুতেই যোগ্য না হন, তাহলে এতদিন কেন ব্যবহার করলেন? এখন জমা দেওয়ার পেছনে নিশ্চয়ই অন্য কারণ আছে।

জানা গেছে, উপদেষ্টাদের কেউ কেউ দ্বৈত নাগরিক। তারা নির্বাচনের পর পরই সাধারণ পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে পাড়ি দিবেন। আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের পরিবার ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেছেন। পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের সন্তানেরা থাকে অস্ট্রেলিয়ায়। তারা সরকার পরিবর্তনের পর আর দেশে থাকবেন না বলে অনেকেরই ধারণা। এ বিষয়ে উপদেষ্টা থাকাকালে এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন সরকার পরিবর্তনের পর কোন উপদেষ্টা কোন দেশে যাবেন- তা ঠিক করেই রেখেছেন।

ওই সময় উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের মন্তব্যের জবাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছিলেন, আমার সেফ এক্সিটের কোন দরকার নেই। অথচ তিনিও লাল পাসপোর্ট জমা দিয়ে সাধারণ পাসপোর্টের আবেদন করেছেন।

এ প্রসঙ্গে সাবেক সচিব ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞ এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, নির্বাচন ঘনিয়ে এসেছে, যা দৃশ্যমান। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষের দিকে। অনেক উপদেষ্টা হয়তো ঝামেলা এড়াতে আগেই পাসপোর্ট জমা দিচ্ছেন। এরকম আরও অনেকেই জমা দিতে পারেন দ্রুতই।

সূত্রঃ দৈনিক ইনকিলাব

এম.কে

আরো পড়ুন

আবারও ভাঙ্গনের মুখে জাপা, এবার জি এম কাদের মাইনাস!

হাসিনার পতন ও বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে যা বললেন এস কে সিনহা

১০ এপ্রিল গণভবন অভিমুখে সোহেল তাজের পদযাত্রা