লেবার পার্টি ক্ষমতায় আসার এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে নীতিগত সিদ্ধান্তে বারবার পিছু হটছে। সর্বশেষ উদাহরণ, আগামী মে মাসে ৩০টি কাউন্সিলে স্থানীয় নির্বাচন স্থগিত করার পরিকল্পনা সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সরকার আবারও রাজনৈতিক চাপ ও আইনি চ্যালেঞ্জের কাছে নতি স্বীকার করল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
স্থানীয় সরকার কাঠামোর বড় পুনর্গঠনের অজুহাতে নির্বাচন পেছানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। তবে সোমবার স্থানীয় সরকার বিষয়ক মন্ত্রী স্টিভ রিড জানান, সাম্প্রতিক আইনি পরামর্শ অনুযায়ী এই সিদ্ধান্ত আর কার্যকর রাখা সম্ভব নয়। নির্বাচন স্থগিতের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছিল রিফর্ম ইউকে, এবং শেষ পর্যন্ত সরকার তাদের আইনি খরচ বহনে সম্মত হয়।
ক্ষমতায় আসার পর এটি লেবার সরকারের ১৪তম বড় ইউ-টার্ন। এর আগেও জনমত, বাজারের প্রতিক্রিয়া এবং দলীয় বিদ্রোহের মুখে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছে সরকার। এই ধারাবাহিক পিছু হটা সরকারকে নীতিগতভাবে দুর্বল ও অস্থির হিসেবে উপস্থাপন করছে বলে সমালোচনা জোরালো হচ্ছে।
ক্ষমতায় আসার আগেই স্যার কিয়ার স্টারমার একাধিক বড় নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাতিল করেছিলেন। ২৮ বিলিয়ন পাউন্ডের সবুজ বিনিয়োগ পরিকল্পনা, ব্যাংকারদের বোনাস সীমা পুনর্বহাল এবং জ্বালানি, পানি ও রয়্যাল মেইল জাতীয়করণের প্রতিশ্রুতি পরিত্যাগ করা হয়, যা দলীয় সমর্থকদের মধ্যেই প্রশ্ন তুলেছিল।
ক্ষমতায় এসে সরকার কর্মীদের জন্য বাধ্যতামূলক ডিজিটাল পরিচয়পত্র চালুর ঘোষণা দিলেও পরে সেখান থেকেও সরে আসে। একসময় বলা হয়েছিল, ডিজিটাল আইডি ছাড়া যুক্তরাজ্যে কাজ করা যাবে না। পরে জানানো হয়, বিকল্প ডিজিটাল নথি দিয়েও কাজের অধিকার প্রমাণ করা যাবে এবং পুরো নীতিটি পরামর্শ প্রক্রিয়ার মধ্যে রাখা হবে।
ব্যবসায়িক কর বা বিজনেস রেট বাড়ানোর সিদ্ধান্তও ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। বিশেষ করে পাব, রেস্তোরাঁ ও নাইটলাইফ খাতে করের চাপ কয়েকগুণ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। প্রবল সমালোচনার মুখে ট্রেজারি শেষ পর্যন্ত পাব শিল্পের জন্য সহায়তা প্যাকেজ আনার ঘোষণা দেয়, যদিও অন্যান্য আতিথেয়তা খাত এখনো অনিশ্চয়তায় রয়েছে।
কৃষিজমির উত্তরাধিকার কর আরোপের ঘোষণার পর দেশজুড়ে কৃষকদের তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। ট্র্যাক্টর নিয়ে ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে বিক্ষোভের পর সরকার করমুক্ত সীমা বাড়াতে বাধ্য হয়। একইভাবে আয়কর বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েও শেষ মুহূর্তে সরকার সিদ্ধান্ত বদলায়, যার প্রভাব পড়ে আর্থিক বাজারে।
নির্বাচনী ইশতেহারে কর্মজীবীদের ওপর কর না বাড়ানোর অঙ্গীকার থাকলেও পরে নিয়োগকর্তাদের জাতীয় বীমা অবদান বাড়ানো হয়। শ্রমিকদের অন্যায্য বরখাস্তের ক্ষেত্রে ‘প্রথম দিন থেকেই অধিকার’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থেকেও সরে এসে ছয় মাসের শর্ত নির্ধারণ করা হয়, যা দলের ভেতরেই অসন্তোষ সৃষ্টি করে।
পঞ্চাশের দশকে জন্ম নেওয়া ওয়াসপি নারীদের ক্ষতিপূরণ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও সরকার প্রবল সমালোচনার মুখে পড়ে। পরে সেই অবস্থান পরিবর্তন করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, যা সরকারের আগের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
শীতকালীন জ্বালানি ভাতা কাটছাঁটের সিদ্ধান্তে স্থানীয় নির্বাচনে নেতিবাচক ফলের পর সরকার দ্রুত ইউ-টার্ন নেয়। নয় মিলিয়নের বেশি পেনশনভোগীর জন্য এই সুবিধা পুনর্বহাল করা হয়। একইভাবে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ভাতা কমানোর পরিকল্পনাও ব্যাকবেঞ্চ এমপিদের বিদ্রোহের মুখে বাতিল করা হয়।
দুই সন্তান সীমা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত, গ্রুমিং গ্যাং নিয়ে জাতীয় তদন্তে সম্মতি এবং সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর নারী সংজ্ঞা বিষয়ে অবস্থান পরিবর্তন—সব মিলিয়ে লেবার সরকারের শাসনামল এখন ‘ইউ-টার্নের সরকার’ হিসেবেই বেশি পরিচিত হয়ে উঠছে।
সর্বশেষ, ঋণ পরিমাপের কঠোর নীতি শিথিল করে অতিরিক্ত ৫০ বিলিয়ন পাউন্ড ঋণ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার ঘোষণাও নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে সমালোচিত হচ্ছে। ধারাবাহিক এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন লেবার সরকারের নীতিগত স্থিরতা ও নেতৃত্বের দৃঢ়তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে।
সূত্রঃ দ্য স্ট্যান্ডার্ড
এম.কে

