চীন মহাকাশে যুদ্ধ সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে এক উচ্চাভিলাষী প্রকল্প উন্মোচন করেছে, যার নাম ‘লুয়াননিয়াও’। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ধারণামূলক ভিডিওতে দেখা গেছে, বিশাল আকৃতির এই উড়ন্ত বিমানবাহী রণতরী পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের প্রান্তে অবস্থান করে মানববিহীন যুদ্ধবিমান মোতায়েন করছে। বেইজিংয়ের দাবি, ভবিষ্যতে এই যান পৃথিবীর কিনারা থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে সক্ষম হবে।
চীনা কর্তৃপক্ষের মতে, লুয়াননিয়াও আগামী ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে কার্যকর হতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ এই প্রকল্প বাস্তবসম্মত কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। অনেকেই এটিকে সামরিক সক্ষমতার চেয়ে রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব তৈরির একটি কৌশল বলে মনে করছেন।
নকশা অনুযায়ী, লুয়াননিয়াও হবে ধূসর রঙের বিশাল ত্রিভুজাকৃতির একটি উড়ন্ত রণতরী। এর দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ২৪২ মিটার এবং প্রস্থ ৬৮৪ মিটার। সর্বোচ্চ উড্ডয়ন ওজন ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন, যা বর্তমানে ব্যবহৃত যেকোনো আকাশযানের তুলনায় অনেক বেশি।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই রণতরী একসঙ্গে সর্বোচ্চ ৮৮টি মানববিহীন ‘শুয়ান নু’ যুদ্ধবিমান বহন করতে পারবে। এসব যুদ্ধবিমান হবে স্টেলথ প্রযুক্তিসম্পন্ন, অত্যন্ত চটপটে এবং হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম। যদিও এগুলোকে ড্রোন বলা হচ্ছে, ওজন ও সক্ষমতার দিক থেকে এগুলো প্রচলিত ড্রোনের চেয়ে অনেক বেশি ভারী।
অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ এশিয়া ইনস্টিটিউটের ভিজিটিং ফেলো ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক পিটার লেটনের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এটি বর্তমান প্রায় সব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ছাড়িয়ে যাবে। তার ভাষায়, বায়ু প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান এমনকি আবহাওয়ার প্রভাব থেকেও এটি অনেকটাই মুক্ত থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, লুয়াননিয়াও চীনকে লক্ষ্যবস্তুর ঠিক ওপর অবস্থান নিয়ে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সক্ষমতা দিতে পারে। এতে করে তাইওয়ান ও দক্ষিণ চীন সাগরের মতো স্পর্শকাতর অঞ্চলে বেইজিং কৌশলগতভাবে বড় সুবিধা পাবে, যা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এই প্রকল্পটি চীনের বৃহত্তর ‘নানতিয়ানমেন প্রকল্প’-এর অংশ, যার অর্থ ‘দক্ষিণ স্বর্গীয় দ্বার’। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অ্যাভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রি করপোরেশন অব চায়নার তত্ত্বাবধানে এই প্রকল্পের আওতায় আকাশ ও মহাকাশ সক্ষমতা বাড়ানোর একাধিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
নানতিয়ানমেন প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ‘বাইদি’। এটি মহাকাশের কাছাকাছি উচ্চতায় কাজ করতে পারবে বলে দাবি করা হচ্ছে। ২০২৪ সালে চীনের আন্তর্জাতিক বিমান ও মহাকাশ প্রদর্শনীতে এই যুদ্ধবিমানের একটি মডেল প্রদর্শন করা হয়।
লুয়াননিয়াও প্রকল্পটি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের চলমান মহাকাশ প্রতিযোগিতার সর্বশেষ উদাহরণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন রকেট ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তিতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। ২০২৪ সালে ‘চাং’ই-৬’ মিশনের মাধ্যমে চাঁদের দূরবর্তী অংশ থেকে সফলভাবে নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনে বেইজিং তার সক্ষমতার প্রমাণ দেয়।
তবে প্রযুক্তিগত দিক থেকে বড় সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরছেন বিশেষজ্ঞরা। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের প্রান্তে স্থিরভাবে অবস্থান করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর মতো প্রযুক্তি বর্তমানে নেই। এ জন্য বিপুল জ্বালানি ও সম্পূর্ণ নতুন ধরনের প্রপালশন ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে, যা এখনো উন্নয়ন পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
বিকল্প হিসেবে লুয়াননিয়াওকে কক্ষপথে পাঠানোর ধারণাও আলোচনায় রয়েছে। কিন্তু কক্ষপথে থাকলে এটি মহাকাশের ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকিতে থাকবে। পাশাপাশি, এমন বিশাল যান উৎক্ষেপণের জন্য চীনের প্রয়োজন হবে পুনঃব্যবহারযোগ্য রকেট, যা এখনো পুরোপুরি সফলভাবে তৈরি করতে পারেনি দেশটি।
এই বাস্তবতায় অনেক বিশ্লেষকের মতে, লুয়াননিয়াও প্রকল্পের ঘোষণা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির চেয়ে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অভ্যন্তরীণভাবে এটি চীনা জনগণকে অনুপ্রাণিত করার একটি হাতিয়ার, আর আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে নিজেদের সামরিক ও প্রযুক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রদর্শনের মাধ্যম।
ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়—লুয়াননিয়াও কি ভবিষ্যতের বাস্তব যুদ্ধযান, নাকি কেবল ‘স্টার ওয়ার্স’-ধাঁচের এক শক্তি প্রদর্শন? উত্তর পেতে হয়তো আরও অনেক বছর অপেক্ষা করতে হবে।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

