11 C
London
April 29, 2026
TV3 BANGLA
আমেরিকা

‘স্বৈরতন্ত্রের অংশ হতে চাই না’: মার্কিন নাগরিকত্ব ছাড়ার হিড়িক

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে সময় লাগে এক বছরেরও বেশি, আর খরচ হয় হাজার হাজার ডলার। তবুও পল, এলা বা মার্গোর মতো হাজারো মার্কিন নাগরিক মনে করছেন, নাগরিকত্ব ত্যাগ করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই।

মার্গো যখন তার মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি ৩০ বছর ধরে লন্ডনে বসবাস করছেন। কিন্তু লন্ডনের মার্কিন কনসুলেটে নাগরিকত্ব ছাড়ার জন্য অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকতে হয় ১৪ মাসেরও বেশি। সিডনি বা কানাডার বড় শহরগুলোতেও চিত্রটা একই। এমনকি ইউরোপের অনেক শহরেই এ প্রক্রিয়ার জন্য অন্তত ছয় মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

বাধ্য হয়ে মার্গো বেলজিয়ামের ঘেন্ট শহরের কনসুলেটে যান। সেখানে গিয়ে তিনি শপথ নিয়ে জানান যে, তিনি স্বেচ্ছায় এবং কারো দ্বারা প্ররোচিত না হয়েই নাগরিকত্ব ছাড়ছেন। গত এক দশকে মার্গোর মতো হাজার হাজার আমেরিকান তাদের পাসপোর্ট ফেরত দিচ্ছেন। ২০০০-এর দশকে এ সংখ্যা বছরে মাত্র কয়েকশ থাকলেও ২০১৪ সালের পর থেকে তা হাজারে পৌঁছেছে। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, কারণ নাগরিকত্ব ত্যাগের সরকারি ফি ২,৩৫০ ডলার থেকে কমিয়ে ৪৫০ ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে।

কিন্তু কেন এ বিমুখতা? বিদেশে মার্কিনীদের ‘অহংকারী’ বা ‘ব্যতিক্রমী’ ভাবমূর্তি নিয়ে কৌতুক দীর্ঘদিনের। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং পররাষ্ট্রনীতি এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ৭৩ বছর বয়সী মেরি ১৯৮৭ সালে কানাডায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘২০১৬ সালের নির্বাচনের রাতটি ছিল আমার জন্য বড় ধাক্কা। যখন দেখলাম ডোনাল্ড ট্রাম্প জিতে যাচ্ছেন, তখনই আমার মোহভঙ্গ হলো’।

ফিনল্যান্ড প্রবাসী ৫৫ বছর বয়সী পল বলেন, ‘৫১তম জন্মদিনে নিজেকে দেওয়া আমার উপহার ছিল ‘আঙ্কেল স্যাম’-এর (যুক্তরাষ্ট্র সরকার) সঙ্গে বিচ্ছেদ’। তিনি জানান, সুপ্রিমকোর্টে অ্যামি কোনি ব্যারেটকে নিয়োগ দেওয়ার সময় ট্রাম্পের চেহারায় যে ‘অহংকারী হাসি’ তিনি দেখেছিলেন, তা দেখেই তিনি নাগরিকত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন।

নরওয়ে প্রবাসী ৩৬ বছর বয়সী জোসেফ সরাসরিই বললেন, ‘আমি কোনো স্বৈরতান্ত্রিক দেশের নাগরিক হয়ে থাকতে চাই না। সামনের নির্বাচনে এ সরকার গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে কিনা, তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে’।

তবে নাগরিকত্ব ত্যাগের এ পথ মোটেও মসৃণ নয়। বিশ্বের বড় বড় দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রই তার নাগরিকদের আয়ের ওপর ‘নাগরিকত্ব-ভিত্তিক’ কর আরোপ করে, তারা বিশ্বের যেখানেই থাকুক না কেন। এ কর জটিলতা এবং আইনি লড়াইয়ের কারণে অনেককে ৭ থেকে ১০ হাজার ডলার পর্যন্ত খরচ করতে হয়। এছাড়া যারা নাগরিকত্ব ছাড়েন, তাদের নাম প্রতি তিন মাস অন্তর সরকারিভাবে অনলাইনে প্রকাশ করা হয়। একে অনেকে ‘নেম অ্যান্ড শেম’ বা জনসমক্ষে লজ্জিত করার কৌশল হিসেবে দেখেন।

আগামী ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হতে যাওয়া একটি নতুন আইন নিয়েও আতঙ্ক কাজ করছে। এ আইনে ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সীদের সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগের (ড্রাফট) জন্য নিবন্ধন প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় করা হয়েছে। অনেক প্রবাসী বাবা-মা তাদের সন্তানদের নিয়ে শঙ্কিত যে, তাদের সন্তানদের হয়তো অনিচ্ছাসত্ত্বেও কোনো যুদ্ধে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে অনেকে জানিয়েছেন, নাগরিকত্ব ছাড়ার পর তারা এক ধরনের স্বস্তি অনুভব করছেন। অ্যামস্টারডাম প্রবাসী ৫৭ বছর বয়সী মাইকেল বলেন, ‘আমার হয়তো আক্ষেপ থাকবে যে, আমি এমন একটি দেশে বড় হতে চেয়েছিলাম যাকে আমি বিশ্বাস করতে পারি। আমেরিকার অনেক কিছুই আমি মিস করব, কিন্তু আর কোনোদিন সেখানে না ফিরলেও আমার কোনো আফসোস থাকবে না’।

(প্রতিবেদনে উল্লেখিত ব্যক্তিদের নিরাপত্তার স্বার্থে নাম পরিবর্তন করা হয়েছে)

লেখক: কলামিস্ট, দ্য গার্ডিয়ান

আরো পড়ুন

জর্জ ফ্লয়েড হত্যায় দোষী সাব্যস্ত সেই সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা

আবারও বাড়লো ডলারের দাম

নিউইয়র্কে পুলিশের গুলিতে বাংলাদেশি তরুণ নিহতঃ সাহায্যের ফোনই হলো মৃত্যুর কারণ