TV3 BANGLA
বাংলাদেশ

হাসিনার পতনের পর প্রথম নির্বাচনে তারেক রহমানের ‘পরিচ্ছন্ন রাজনীতি’র অঙ্গীকার

হাসিনার পতনের পর প্রায় দুই দশকের মধ্যে প্রথম অবাধ ও সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। এই নির্বাচনে ১৭ বছর নির্বাসন শেষে দেশে ফেরা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারিক রহমান প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রধান দাবিদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। ভোট শুরুর আগে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে “উপর থেকে নিচ পর্যন্ত শূন্য সহনশীলতা” নীতি গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরিচ্ছন্ন রাজনীতির নতুন যুগের অঙ্গীকার করেছেন।

 

বিভিন্ন জরিপে ইঙ্গিত মিলেছে, বিএনপি উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে এগিয়ে থাকতে পারে এবং ২০ বছর পর আবারও ক্ষমতায় ফিরতে পারে। তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছে ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী, যারা নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক মাঠে সক্রিয় হয়েছে এবং শক্তিশালী বিরোধী শক্তি হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

তারেক রহমান বলেছেন, আগের সরকারের আমলে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল এবং অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি স্বীকার করেন, পরিবর্তন আনতে সময় লাগবে, তবে সরকারে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা গেলে এবং প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে কঠোর বার্তা পৌঁছে দেওয়া গেলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে। অতীতে বিএনপি সরকারের সময়কার ভুল-ত্রুটির কথাও তিনি অস্বীকার করেননি।

২০২৪ সালের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার পতন ঘটে। জাতিসংঘের হিসাবে সেই সময়ের সহিংস দমন-পীড়নে প্রায় ১,৪০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। পরবর্তীতে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে হাসিনা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং বর্তমানে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন।

হাসিনার পতনের পর নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল গণতান্ত্রিক পরিবেশ পুনরুদ্ধার এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও অর্থনৈতিক স্থবিরতা দেশকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখেছে।

দেশজুড়ে ১২ কোটি ৭০ লাখের বেশি নিবন্ধিত ভোটার রয়েছেন। নির্বাচনকে সহিংসতামুক্ত রাখতে ৯ লাখের বেশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ ১৭ বছর পর এটি দেশের প্রথম বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন, যা গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় তরুণ ভোটারদের মধ্যে উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা গেছে। অনেকেই জানিয়েছেন, অতীতে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে না পারার অভিজ্ঞতার পর এবার স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ তাদের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ।

তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবন বিতর্কমুক্ত নয়। ২০০৭ সালে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হন তিনি, যা তিনি অস্বীকার করেন। কারাগারে নির্যাতনের শিকার হয়ে চিকিৎসার জন্য ২০০৮ সালে লন্ডনে যান এবং সেখানেই দীর্ঘদিন অবস্থান করেন।

হাসিনার শাসনামলে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়, যা তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন। ২০২৪ সালে আদালত তার দণ্ড বাতিল করলে দেশে ফেরার পথ সুগম হয়।

নির্বাসনকালে লন্ডনে কাটানো সময় তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রভাব ফেলেছে বলে ঘনিষ্ঠজনেরা মনে করেন। তিনি রাজনৈতিক সহনশীলতা বাড়ানো ও নাগরিক সেবা উন্নত করার মতো বিষয়ে জোর দেওয়ার কথা বলেছেন।

তবে তার প্রত্যাবর্তন নিয়ে সংশয়ও রয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে দুটি রাজনৈতিক পরিবারের প্রভাবশালী অবস্থান নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্বের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

এদিকে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোট শরিয়া আইন প্রবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক মাঠে সক্রিয় হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো নারীদের ওপর নৈতিক চাপ ও সামাজিক বিধিনিষেধ বৃদ্ধির বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। তারেক রহমান এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন উগ্রপন্থী কর্মকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলে চরমপন্থা কমে আসবে।

নতুন সরকারের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন। হাসিনার সময়ে দুই দেশের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ ছিল, তবে তার পতনের পর সম্পর্কের টানাপোড়েন বেড়েছে। তারিক রহমান পারস্পরিক সম্মান ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলেছেন, তবে ভারতের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন।

এই নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য এক সন্ধিক্ষণ। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতার পর দেশটি গণতান্ত্রিক ধারায় কতটা দৃঢ়ভাবে ফিরতে পারে—তা নির্ধারণ করবে বর্তমান ভোট এবং পরবর্তী সরকারের কার্যক্রম।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

ভারতের রাষ্ট্রদূতকে ঢাকায় তলবঃ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিবাদ

নিউজ ডেস্ক

বাংলাদেশসহ ৯ দেশ গাজায় রমজানে ত্রাণ পাঠাল

অরেঞ্জ কর্নারস গ্লোবাল প্ল্যাটফর্মে নতুন ব্যাচে বাংলাদেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের আবেদনের সুযোগ