লন্ডনে বসবাসরত এক ইতালীয় প্রকৌশলীকে ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে থাকার অনুমতি দেওয়া হলেও এখন সেই সিদ্ধান্তকে ‘ভুল’ বলে দাবি করেছে দেশটির হোম অফিস। এর ফলে ওই ব্যক্তির নিজের যুক্তরাজ্যে থাকার অধিকার বহাল থাকলেও তার ব্রাজিলীয় স্ত্রীর দেশটিতে থাকার অধিকার নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা।
৩৩ বছর বয়সী ওই ইতালীয় নাগরিকের নাম ফাবিও। পরিচয় গোপন রাখার জন্য তার নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। ২০১৮ সালে পিএইচডি শেষ করতে লন্ডনে আসেন তিনি। পরে জ্বালানি ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে কাজ করে যুক্তরাজ্যে নিজের পেশাগত জীবন গড়ে তোলেন।
ফাবিওর দাবি, ব্রেক্সিটের পর থেকে তিনি যুক্তরাজ্যের কোনো আইন বা অভিবাসন-সংক্রান্ত নিয়ম ভঙ্গ করেননি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকদের জন্য চালু করা বসবাস-ব্যবস্থার আওতায় তিনি স্থায়ী বসবাসের মর্যাদাও পান। পাঁচ বছর যুক্তরাজ্যে বসবাসের পর যোগ্য ইউরোপীয় নাগরিকদের এই মর্যাদা দেওয়ার বিধান রয়েছে।
কিন্তু চলতি বছরের এপ্রিল মাসে হোম অফিস তাকে চিঠি দিয়ে জানায়, তার স্থায়ী বসবাসের মর্যাদা দেওয়ার সিদ্ধান্তটি ‘ভুলবশত’ হয়েছিল।
হোম অফিসের দাবি, ফাবিও ইতালীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে যে নথি জমা দিয়েছিলেন, তা যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর—ব্রেক্সিট-পরবর্তী নির্ধারিত সময়সীমার আগে—তিনি ইতালীয় নাগরিক ছিলেন, এমন প্রমাণ প্রয়োজন বলে জানানো হয়েছে।
ফাবিও ব্রাজিলে জন্মগ্রহণ করলেও জন্মসূত্রে ইতালির দ্বৈত নাগরিক। স্থায়ী বসবাসের মর্যাদার আবেদনের সময় তিনি ইতালীয় কনস্যুলেট থেকে পাওয়া নাগরিকত্বের সনদও জমা দিয়েছিলেন।
তবে পুরোনো আবেদন পর্যালোচনার পর হোম অফিস সিদ্ধান্তে আসে যে, বর্তমানে হাতে থাকা তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে তাকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নাগরিকদের বসবাস-ব্যবস্থার আওতায় স্থায়ী বসবাসের মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল ‘ভুলবশত’।
সবচেয়ে বড় জটিলতা তৈরি হয়েছে তার স্ত্রীকে ঘিরে। ফাবিওকে যুক্তরাজ্যে থাকতে দেওয়া হলেও হোম অফিস জানিয়েছে, তাকে আর সংশ্লিষ্ট ইউরোপীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। ফলে তার ব্রাজিলীয় স্ত্রী স্বামীর মর্যাদার ভিত্তিতে যুক্তরাজ্যে থাকার জন্য পরিবারের সদস্য হিসেবে স্পনসর হওয়ার সুযোগ হারিয়েছেন।
অর্থাৎ, হোম অফিসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফাবিও নিজে যুক্তরাজ্যে থাকতে পারলেও তার স্ত্রীকে একই অধিকারের আওতায় রাখার সুযোগ নেই।
এ ঘটনায় গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন ফাবিও। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে তারা যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন, সব নিয়ম মেনে চলেছেন এবং দেশটিকেই নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার জায়গা হিসেবে দেখেছেন।
ফাবিও বলেন, তারা পরিবার শুরু করা এবং নিজেদের জন্য একটি বাড়ি কেনার পরিকল্পনা করছিলেন। কিন্তু হোম অফিসের এই সিদ্ধান্তের পর তাদের সব পরিকল্পনা থেমে গেছে। দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে বসবাসের পর হঠাৎ করে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়াকে তিনি অত্যন্ত কষ্টদায়ক ও হতাশাজনক বলে বর্ণনা করেছেন।
ফাবিও একা নন। হোম অফিস অন্তত ১০০ জন ইউরোপীয় নাগরিককে জানিয়েছে যে তাদের ইউরোপীয় ইউনিয়ন নাগরিকদের বসবাস-ব্যবস্থার আওতায় মর্যাদা দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘ভুল’ হয়েছিল। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফাবিওর ঘটনা সামনে আসার পর বিষয়টি নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউরোপীয় ইউনিয়ন আইনের অধ্যাপক ক্যাথরিন বার্নার্ড বলেছেন, তিনি এই ঘটনায় বিস্মিত। তার মতে, হোম অফিসের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ইউরোপীয় নাগরিকদের জন্য এক ধরনের ‘দুই স্তরের’ অধিকারব্যবস্থা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে ব্রেক্সিট-পরবর্তী প্রত্যাহার চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধানের কথা উল্লেখ করেছেন। ওই বিধান অনুযায়ী, নাগরিকদের বসবাসের অধিকার অর্জন, ধরে রাখা বা হারানোর ক্ষেত্রে স্বাগতিক রাষ্ট্র নতুন কোনো সীমাবদ্ধতা বা শর্ত আরোপ করতে পারে না।
বার্নার্ডের মতে, ফাবিওর স্থায়ী বসবাসের মর্যাদা বহাল রেখে একই সঙ্গে তার পারিবারিক অধিকার অস্বীকার করার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘দ্য থ্রি মিলিয়ন’-এর ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী মনিক হকিন্সও হোম অফিসের পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত শুধু একজন ব্যক্তির ওপর নয়, পুরো পরিবারের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। হঠাৎ করে অধিকার হারানোর এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যাকে তিনি ‘অধিকার হারানোর খাদের কিনারায়’ পৌঁছে যাওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন।
তার মতে, প্রত্যাহার চুক্তির অধীনে প্রয়োজনীয় আনুপাতিকতা যাচাই না করেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করবে।
ব্রেক্সিট-পরবর্তী নাগরিক অধিকার রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাধীন পর্যবেক্ষণ কর্তৃপক্ষও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। সংস্থাটি হোম অফিসের কাছে চিঠি দিয়ে পুরোনো আবেদনগুলোর সিদ্ধান্ত নতুন করে পর্যালোচনা করে পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
সংস্থাটির আশঙ্কা, হোম অফিসের এ ধরনের পদক্ষেপ যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে করা প্রত্যাহার চুক্তির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।
এদিকে ফাবিওর পক্ষে আইনি লড়াই করছে লন্ডনের উইলসন সলিসিটর্স। প্রতিষ্ঠানটির অংশীদার মালা সাভজানি প্রশ্ন তুলেছেন, দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা ইউরোপীয় নাগরিকদের কেন এভাবে নতুন করে যাচাই-বাছাইয়ের আওতায় আনা হচ্ছে।
তার অভিযোগ, হোম অফিসকে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের জটিল নাগরিকত্ব আইন ব্যাখ্যা করতে হচ্ছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে যাচাই না করা তথ্য বা দাবির ওপরও নির্ভর করতে হচ্ছে। কেন সরকার এ ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে, তার নীতিগত উদ্দেশ্যও স্পষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে হোম অফিস বলেছে, ব্যক্তিগত কোনো ঘটনা নিয়ে তারা সাধারণত মন্তব্য করে না।
একই সঙ্গে সরকারের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, এ ধরনের ঘটনা প্রত্যাহার চুক্তির লঙ্ঘন নয়। তাদের বক্তব্য, যেসব ব্যক্তিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নাগরিকদের বসবাস-ব্যবস্থার আওতায় ‘ভুলবশত’ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, তারা প্রত্যাহার চুক্তির সুবিধাভোগী হিসেবে বিবেচিত হবেন না।
হোম অফিসের ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যদি প্রমাণ করতে না পারেন যে তারা ওই মর্যাদা পাওয়ার প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করেছিলেন, তাহলে তাদের ইউরোপীয় ইউনিয়ন নাগরিকদের বসবাস-ব্যবস্থার আওতায় থাকার যোগ্যতার কোনো ভিত্তি নেই।
তবে ফাবিওর ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—একবার স্থায়ী বসবাসের মর্যাদা দেওয়ার পর বহু বছর ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী কোনো ব্যক্তির পুরোনো আবেদনকে নতুন করে ‘ভুল’ ঘোষণা করে তার পারিবারিক অধিকার সীমিত করা কতটা আইনসংগত।
এই ঘটনায় শুধু একজন ইতালীয় নাগরিকের ভবিষ্যৎ নয়, ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাজ্যে বসবাসের অধিকার পাওয়া হাজারো ইউরোপীয় নাগরিকের অধিকার ও তাদের পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

