ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক রূপান্তরের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট (BEI) আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আলোচনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, সুশীল সমাজের সদস্য ও সাবেক কূটনীতিকরা অংশ নেন।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ প্রথম দিন থেকেই পূর্ণাঙ্গ সংসদ হিসেবে স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে। সরকার গঠন, বাজেট প্রণয়নসহ রাষ্ট্র পরিচালনার সকল দায়িত্ব সংসদ পালন করবে। একই সঙ্গে সংসদটি ১৮০ দিনের জন্য ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবেও কাজ করবে, যাতে সংবিধানে প্রয়োজনীয় মৌলিক সংস্কার আনা সম্ভব হয়।
সংসদ সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করলে ক্ষমতা হস্তান্তর বিলম্বিত হবে—এমন ধারণাকে তিনি বিভ্রান্তিকর বলে উল্লেখ করেন। তার মতে, সরকার পরিচালনা ও সংস্কার কার্যক্রম একসাথেই এগিয়ে নেওয়া সম্ভব এবং এ দুটি দায়িত্ব পরস্পরের পরিপূরক।
বর্তমান সংবিধানের কাঠামো ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণকে উৎসাহিত করেছে বলেও মন্তব্য করেন আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, এই কাঠামোর সুযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভবিষ্যতে আদালতে ‘বেসিক স্ট্রাকচার ডকট্রিন’ দেখিয়ে যেন সংস্কার বাতিল না করা যায়, সে জন্য ত্রয়োদশ সংসদকে গণপরিষদীয় ক্ষমতা বা Constituent Power প্রদান করা জরুরি।
জুলাই জাতীয় সনদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি কোনো অন্তর্বর্তী সরকারের একক এজেন্ডা নয়। বরং প্রায় নয় মাস ধরে ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে গড়ে ওঠা একটি সামাজিক চুক্তি। রাজনৈতিক দলগুলো যদি এটিকে “বিজনেস অ্যাজ ইউজুয়াল” হিসেবে গ্রহণ করে, তাহলে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের ঐতিহাসিক সম্ভাবনা ব্যর্থ হয়ে যাবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
প্রস্তাবিত গণভোট সম্পর্কে আলী রীয়াজ বলেন, অতীতের গণভোটগুলো ছিল ক্ষমতায় টিকে থাকার রাজনৈতিক হাতিয়ার। তবে এবার প্রস্তাবিত গণভোট হবে সংস্কার বিষয়ে জনগণের সম্মতি নেওয়ার একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, যা কোনো ব্যক্তি বা সরকারের আস্থাভোট নয়।
তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রায়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, দলীয় সংস্কার বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়; এটি দলগুলোর ভেতর থেকেই আসতে হবে। একইসঙ্গে জুলাই আন্দোলনে নারীদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকার কথা তুলে ধরে সংসদে নারীদের সংরক্ষিত আসন ১০০-তে উন্নীত করা এবং ৫ শতাংশ আসনে সরাসরি নারী মনোনয়নের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর স্পষ্ট অবস্থান দাবি করেন।
গোলটেবিল আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা আসন্ন নির্বাচনকে সহিংসতামুক্ত, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং জাতীয় ঐকমত্যের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
সূত্রঃ ৭১ টিভি
এম.কে

