ব্রাইটনকে সাধারণত আধুনিক, সহনশীল ও সফল একটি ব্রিটিশ শহর হিসেবে তুলে ধরা হয়। পর্যটননির্ভর অর্থনীতি, স্বাধীন ব্যবসায় ভরা শপিং স্ট্রিট এবং বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি শহরটিকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। তবে এই উজ্জ্বল ভাবমূর্তির আড়ালে ভয়াবহ বাস্তবতার কথা উঠে এসেছে শহরের অন্যতম ব্যস্ত সড়ক সেন্ট জেমস স্ট্রিট থেকে।
সমুদ্রতীরবর্তী এই সড়কটি এখন দোকানচুরি, প্রকাশ্যে মাদক সেবন ও বিক্রি, সহিংসতা, চিৎকার-চেঁচামেচি এবং প্রকাশ্যে মানব মলমূত্র ত্যাগের মতো ঘটনায় জর্জরিত—এমন অভিযোগ করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কর্মীরা। তাদের ভাষায়, এলাকাটি যেন চার্লস ডিকেন্সের কোনো অন্ধকার উপন্যাসের দৃশ্য।
স্থানীয় দোকান মালিক নিল স্ট্রিবলিং-রাশটন জানান, সমাজবিরোধী আচরণ এখানে এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে মানুষ প্রায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তার ভাষায়, পাশের কো-অপ সুপারশপটি প্রায় প্রতিদিনই দোকানচুরির শিকার হয় এবং প্রায়ই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে রাস্তায়। অনেক সময় এসব মারামারি দেখে মনে হয় কোনো সিনেমার দৃশ্য চলছে, অথচ এটি তাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা।
তার স্বামী ফ্র্যাঙ্ক স্ট্রিবলিং-রাশটন ২০২৪ সালের একটি ঘটনার কথা স্মরণ করে বলেন, শনিবার বিকেলে খোলা রাস্তায় প্রকাশ্যে মারামারি চলছিল, যখন মানুষ বাইরে বসে খাবার খাচ্ছিল। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে একপর্যায়ে একজন আহত ব্যক্তির জন্য অ্যাম্বুলেন্স ডাকার অনুরোধ জানাতে হয়।
দোকান মালিকদের অভিযোগ, চুরি শুধু খাদ্য সংকটের কারণে নয়; বরং মাদকাসক্তরা দামি পণ্য চুরি করে তা বিক্রি করে পরবর্তী মাদক কেনার অর্থ জোগাড় করে। আশপাশের হোস্টেল ও অস্থায়ী আবাসনে বড় সংখ্যায় মাদকাসক্ত মানুষকে একত্রে রাখায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বলে মনে করেন তারা।
ফ্র্যাঙ্ক স্ট্রিবলিং-রাশটনের অভিযোগ, স্থানীয় পুলিশ স্টেশন মাত্র কয়েকটি রাস্তা দূরে হলেও নিয়মিত সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা চলতেই থাকে। তার মতে, এটি এমন এক পরিস্থিতি যেখানে নাগরিক সমাজ ভেঙে পড়েছে এবং আইনশৃঙ্খলার উপস্থিতি কার্যত অনুভূত হয় না।
একাধিক ব্যবসায়ী জানান, পুলিশ গাড়ি মাঝেমধ্যে রাস্তা দিয়ে চলে গেলেও থামে না। ফলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। নিলের ভাষায়, এখন আর সীগালের ডাক শোনা যায় না—চারপাশ ভরে থাকে চিৎকার আর গালাগালিতে। তিনি সড়কটিকে সরাসরি “পাগলা গারদ” বলে বর্ণনা করেন।
সেন্ট জেমস স্ট্রিটের একাধিক স্থানে প্রকাশ্যে প্রস্রাব ও মলত্যাগের অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয় পাব মালিক স্যাম মরগান জানান, তিনি দিনের আলোতেই মানুষকে প্রকাশ্যে ক্র্যাক ধূমপান করতে দেখেছেন। নিজের বাসার সামনেও মানব মলমূত্র দেখতে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
আরেক দোকানি কার্পেশ প্যাটেল বলেন, এটি এখন “মদ ও সহিংসতায় ডুবে থাকা একটি রাস্তা”, যেখানে সবাইকে সতর্ক থাকতে হয়। তার মতে, চুরি ও মারামারি নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং পুলিশ না থাকায় ব্যবসায়ীরা নিজেদের অনিরাপদ বোধ করেন।
তবে কেউ কেউ মনে করেন, সমস্যার মূল কারণ সামাজিক সহায়তার অভাব। দীর্ঘদিনের ব্যবসায়ী গ্যারি বলেন, অনেক মানুষ প্রকৃতপক্ষে সাহায্যের প্রয়োজন, কিন্তু সেই সহায়তা তারা পাচ্ছে না। আবার কেউ কেউ শুধু মনোযোগ পাওয়ার জন্য বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে বলেও তার মত।
সাসেক্স পুলিশ জানিয়েছে, সেন্ট জেমস স্ট্রিট তাদের অগ্রাধিকারভুক্ত ‘হটস্পট’ এলাকা। এখানে বাড়তি পুলিশি টহল ও গোয়েন্দাভিত্তিক অভিযান চলছে বলে দাবি করা হয়। পুলিশ আরও জানায়, ২০২৫ সালের অক্টোবরে সংঘটিত এক ছিনতাই মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তি বর্তমানে কারাগারে রয়েছে এবং শিগগিরই তার সাজা ঘোষণা হবে।
তবে ব্রাইটন অ্যান্ড হোভ সিটি কাউন্সিল এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। স্থানীয়দের প্রশ্ন—পর্যটননির্ভর শহরের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক কবে আবার নিরাপদ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে?
সূত্রঃ দ্য এক্সপ্রেস
এম.কে

