7.9 C
London
January 27, 2026
TV3 BANGLA
বাংলাদেশ

আদানির চুক্তিতে বছরে গচ্চা যাচ্ছে ৬ হাজার কোটি টাকা

ভারতের আদানি গ্রুপের সঙ্গে করা অসম বিদ্যুৎ চুক্তির কারণে বছরে বাংলাদেশের গচ্চা যাচ্ছে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। প্রতি বছর এ চুক্তির ফলে বাংলাদেশকে ৪০০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার বেশি দিতে হচ্ছে। এ চুক্তিতে ব্যাপক দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে। বাংলাদেশ সরকার চাইলে এ চুক্তি বাতিল করতে পারবে এবং এজন্য ক্ষতিপূরণ চাইতে পারবে। এ চুক্তির সঙ্গে জড়িত সাত-আটজন ব্যক্তির অবৈধ সুবিধা নেওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।

গতকাল বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন-২০১০-এর অধীনে সম্পাদিত চুক্তি পর্যালোচনা জাতীয় কমিটি বিদ্যুৎ ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। কমিটি বলেছে, শেষ সময়ে এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার কিচূ করতে পারবে না, তবে নির্বাচিত সরকারকেই এখন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কমিটি আদানির সঙ্গে করা বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি বাতিলে সিঙ্গাপুরের সালিশি আদালতে যাওয়ার পরামর্শও দিয়েছে। এ ছাড়া কমিটি আদানির সঙ্গে করা চুক্তিকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে ‘খারাপ’ চুক্তি বলে অভিহিত করেছে।

 

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, আদানির সঙ্গে করা চুক্তির বিষয়ে নির্দেশনা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যালয় থেকেই আসত। আর এ চুক্তির সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের কয়েক মিলিয়ন ডলারের আর্থিক সুবিধা নেওয়ার তথ্যও কমিটির হাতে এসেছে।

অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ৫ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করে। হাই কোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে কমিটিতে ছিলেন বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবদুল হাসিব চৌধুরী, কেপিএমজি বাংলাদেশ সাবেক সিওও আলী আশরাফ, বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন, ইউনির্ভাসিটি অব লন্ডনের ফ্যাকাল্টি অব ল অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান। কমিটি গত ২০ জানুয়ারি মন্ত্রণালয়ে বিশেষ আইনে করা চুক্তিগুলোর বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।

গতকাল সাংবাদিকদের চূড়ান্ত এ প্রতিবেদন সম্পর্কে জানানো হয়। কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সালে পিডিবির লোকসান ছিল সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা আর ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি। বিদ্যুৎ কিনতে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় খরচ হয় ১২ টাকা ৩৫ পয়সা, কিন্তু বিক্রি হয় ৬ টাকা ৬৩ পয়সায়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৪ গুণ। বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে দেওয়া টাকা বেড়েছে ১১ গুণেরও বেশি। ক্যাপাসিটি পেমেন্টের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ২০ গুণ।

জাতীয় কমিটির হিসাব অনুযায়ী, মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের মধ্যে ৭ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট থেকে ৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার হয় না। জ্বালানি এবং অবকাঠামোর অভাবেই এ বিদ্যুৎ ব্যবহার হয় না। এতে আরও বলা হয়, এইচএফও বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনতে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ টাকা বেশি খরচ হয়। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে খরচ হয় ৪৫ শতাংশ বেশি। সৌর বিদ্যুৎ কিনতে স্বাভাবিক দামের চেয়ে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বেশি খরচ হয়।

কমিটি জানায়, জরুরি আইনের আড়ালে এ চুক্তিগুলো জাতীয় স্বার্থের চেয়ে একটি সীমিত গোষ্ঠীর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। বড় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদক যারা সময়ের সঙ্গে ও বিভিন্ন প্রযুক্তিতে একাধিক চুক্তি পেয়েছে তারা এতে উপকৃত হন। নির্বাচিত দেশি-বিদেশি স্পন্সররা লাভবান হয়েছে সার্বভৌম গ্যারান্টি ও আন্তর্জাতিক সালিশি সুরক্ষার মাধ্যমে। অল্প কিছু স্পন্সরের কাছে চুক্তি কেন্দ্রীকরণ করায় দর কষাকষিতে তারা লাভবান হয়েছে।

কমিটি আরও উল্লেখ করেছে, বিতর্কিত কয়েকটি চুক্তির মধ্যে আছে আদানির বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুক্তি। এটি দেশের বাইরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, কিন্তু ঝুঁকি বাড়ে বাংলাদেশের। এসএস পাওয়ারের এ চুক্তিতে দুটি বড় কেন্দ্র স্থাপন হয়। সামিট মেঘনাঘাটের ক্ষেত্রে গ্যাস শেষের পথে জেনেও এক জায়গায় একাধিক বড় কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে জানা যায়।

রিলায়েন্স জেরার ক্ষেত্রে ভারতে পড়ে থাকা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাংলাদেশে চালানোর বিষয় উল্লেখ করা হয়। পায়রার ক্ষেত্রে যেখানে বন্দরই ঠিকমতো কাজ করে না, সেখানে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। আবার আদানির ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক বছরে অন্য বিদ্যুৎ আমদানির উৎস থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং বিদ্যুৎ ক্রয় যুক্তিসংগত দামের চেয়ে ৪ থেকে ৫ সেন্ট (প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা) বেশি।

সামিট মেঘনাঘাট-২ (গ্যাস) সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর গড় ব্যয়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ইউনিট খরচ দেখা যায়। আবার সামিট বরিশাল (এইচএফও) অন্য এইচএফও কেন্দ্রের চেয়ে ব্যয়বহুল। এসএস পাওয়ারে সমমানের কয়লাভিত্তিক বিকল্প কেন্দ্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প। আর এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রেও চুক্তিতে রাজনৈতিক আশীর্বাদে থাকা স্পন্সর ও আমলাতান্ত্রিক অংশীদারত্বের যোগসাজশ পাওয়া যায়। এ চুক্তির কারণে সরকারের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেড়েছে ভর্তুকি, লোকসান ও বকেয়া।

জাতীয় কমিটি সুপারিশ করেছে আগামীতে সব বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি, সংশোধনী ও পরিশোধ সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করতে হবে। প্রতিযোগিতামূলক প্রকিউরমেন্ট পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। কার্যকর ও স্বচ্ছ প্রকিউরমেন্ট নিশ্চিত করতে হবে। স্বাধীন জ্বালানি তদারকি প্রতিষ্ঠান গঠন করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানদে দুর্নীতির প্রমাণ মিললে চুক্তি বাতিল করতে হবে। জাতীয় কমিটির প্রধান হাই কোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বল এখন বিদ্যুৎ বিভাগের কোর্টে। আদানির মামলার বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে যেহেতু অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে সময় নেই।

আমরা চাইব পরবর্তী সরকার যেন এ বিষয়ে উদ্যোগী হয়। বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ এবং এ কমিটির সদস ড. জহিদ হোসেন বলেন, এ চুক্তিগুলো স্পষ্টতই জাতীয় স্বার্থের চেয়ে একটি সীমিত গোষ্ঠীর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। অর্থবছর ২০১১ থেকে ২০২৪-এর মধ্যে স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের পরিশোধিত অর্থ ১১ গুণ বেড়েছে, অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে মাত্র ৪ গুণ। বিপিডিবি বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসান গুনছে এবং ২০২৫ অর্থবছরে এর বকেয়া দায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে। উৎপাদন সক্ষমতায় উদ্বৃত্ত থাকা সত্ত্বেও সিস্টেমের ব্যবহার হার মাত্র ৪০-৫০ শতাংশ।

কমিটি হিসাব করেছে, অতিরিক্ত বা অকার্যকর সক্ষমতার বার্ষিক আর্থিক ব্যয় প্রায় ৯০০ মিলিয়ন থেকে ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এতে দেউলিয়ার পথে রয়েছে বিপিডিবি। তিনি বলেন, ঘাটতি ঠেকাতে গেলে পাইকারি দাম ৮৬ শতাংশ বাড়াতে হবে। আর ৮৬ শতাংশ দাম বাড়ালে ভারত-চীন- ভিয়েতনাম ও শ্রীলংকার চেয়ে বেশি হয়ে যাবে। ওইসব দেশের শিল্পের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না বাংলাদেশের শিল্প।

এম.কে

আরো পড়ুন

টিভিথ্রি বাংলার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মঈনুল হোসেন মুকুলের মা ইয়াকুতুন নেসার ইন্তেকাল

নিউজ ডেস্ক

গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাড়িতে উঠছেন তারেক রহমান, স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে প্রস্তুত বিএনপি

সিলেটের জন্য তেড়ে আসছে ‘দুঃসংবাদ’!