19.5 C
London
September 19, 2026
TV3 BANGLA
ফিচার

ইন্দোনেশিয়ার বাঁশের মসজিদঃ শতাব্দী পেরিয়েও টিকে আছে বায়ান বিলেকের ঐতিহ্য

আধুনিক স্থাপত্যের যুগেও প্রকৃতির উপকরণে তৈরি শতাব্দীপ্রাচীন স্থাপনা মানুষকে বিস্মিত করে। তেমনই এক অনন্য নিদর্শন ইন্দোনেশিয়ার লোম্বোক দ্বীপের বায়ান গ্রামে অবস্থিত বায়ান বিলেক মসজিদ। বাঁশ, কাঠ, মাটি ও পাথরের সমন্বয়ে নির্মিত এই প্রাচীন মসজিদ লোম্বোকে ইসলামের ইতিহাস ও স্থানীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হিসেবে পরিচিত।

পশ্চিম নুসা তেঙ্গারা প্রদেশের নর্থ লোম্বোক রিজেন্সিতে অবস্থিত বায়ান অঞ্চলটি লোম্বোক দ্বীপে ইসলাম প্রচারের প্রাথমিক কেন্দ্রগুলোর একটি। ঐতিহাসিক গবেষণায় বায়ান বিলেক মসজিদকে ষোড়শ অথবা সপ্তদশ শতাব্দীর স্থাপনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ কয়েক শতাব্দী ধরে নানা পরিবর্তনের মধ্যেও মসজিদটির ঐতিহ্য টিকে আছে।

মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতা নিয়ে অবশ্য একাধিক মত রয়েছে। স্থানীয় জনশ্রুতিতে সুফি সাধক শায়খ গাউস আবদুর রাজ্জাকের নাম পাওয়া যায়। আবার কিছু বর্ণনায় সানান গিরি বা সানান কালিসাগারের অনুসারী টিটি মাস পেংঘুলুকে এর প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। অন্য একটি ঐতিহাসিক বর্ণনায় সুফি সাধক সুলতান প্রাপেনের নামও উঠে আসে। এসব ভিন্ন বর্ণনার মধ্যেও বায়ান বিলেককে লোম্বোকে ইসলামের প্রাথমিক বিস্তারের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে দেখা হয়।

বায়ান বিলেকের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য তার নির্মাণশৈলী। প্রায় ৯ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৯ মিটার প্রস্থের বর্গাকার মসজিদটির আয়তন প্রায় ৮১ বর্গমিটার। বাইরে থেকে দেখতে এটি আধুনিক মসজিদের মতো নয়; বরং স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী বাড়ির মতো সরল কাঠামোর।

দেয়ালে রয়েছে বাঁশের বুনন, আর ছাদ তৈরি হয়েছে বাঁশের চেরা অংশ দিয়ে। মেঝেতে আধুনিক টাইলস বা সিমেন্টের বদলে মাটি ও রিডের মাদুর ব্যবহারের ঐতিহ্য রয়েছে। মসজিদের ভিত্তিতে ব্যবহার করা হয়েছে নদীর মসৃণ পাথর। পুরো কাঠামোটি চারটি গোলাকার কাঁঠাল কাঠের প্রধান খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

মসজিদের ভেতরে ঝুলছে ঐতিহ্যবাহী কাঠের ঢোল, স্থানীয়ভাবে যাকে ‘বেদুগ’ বলা হয়। মসজিদ প্রাঙ্গণের সঙ্গে শায়খ গাউস আবদুর রাজ্জাকের মাজারের কথাও উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি রয়েছে মসজিদের সেবায়েত ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের স্মৃতিবিজড়িত ছোট কুঁড়েঘর।

বায়ান বিলেকের সঙ্গে উত্তর লোম্বোকের ‘ওয়েতু তেলু’ ঐতিহ্যেরও সম্পর্ক রয়েছে। স্থানীয়ভাবে এটি পৃথক কোনো ধর্মের পরিবর্তে স্রষ্টা, মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার একটি ঐতিহ্যবাহী জীবনদর্শন হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। মসজিদের মাথা, শরীর ও পায়ের প্রতীকী বিন্যাসকেও স্থানীয় মহাজাগতিক ধারণায় ঊর্ধ্ব, মধ্য ও নিম্ন জগতের ভারসাম্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।

বর্তমানে মসজিদটি নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য ব্যবহৃত হয় না। তবে ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) এবং হিজরি নববর্ষের মতো বিশেষ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মসজিদ প্রাঙ্গণ আবারও মানুষের সমাগমে মুখর হয়ে ওঠে।

এসব আয়োজনে স্থানীয় ঐতিহ্য মেনে ‘সাসাক’ পোশাক পরার রীতি রয়েছে। অজুর জন্য মাটির পাত্র, পানি তোলার জন্য নারকেলের খোলস এবং বসার জন্য বেতের তৈরি মাদুর ব্যবহারের মতো প্রাচীন রীতিও সেখানে সংরক্ষিত রয়েছে।

লোম্বোকের মাতরাম শহর থেকে বায়ান গ্রামের দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার। জাকার্তা, সুরবায়া কিংবা বালি থেকে বিমানে লোম্বোক পৌঁছে সড়কপথে বায়ান গ্রামে যাওয়া যায়। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহী পর্যটকদের কাছে তাই কয়েক শতাব্দী পুরোনো এই বাঁশের মসজিদ লোম্বোকের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থাপনা হয়ে উঠেছে।

প্রকৃতির উপকরণে নির্মিত সরল কাঠামো, ইসলামের প্রাথমিক বিস্তারের ইতিহাস এবং স্থানীয় সাংস্কৃতিক রীতির সমন্বয়ে বায়ান বিলেক মসজিদ আজও লোম্বোকের ঐতিহ্যের একটি জীবন্ত প্রতীক হয়ে রয়েছে।

সূত্রঃ লোম্বোক ডিসপ্যাচ ডটকম

এমকে

আরো পড়ুন

দুঃসংবাদ পেল অ্যাপল

নিউজ ডেস্ক

মডার্নার করোনা ভ্যাকসিন ৯৫ শতাংশ কার্যকর

অনলাইন ডেস্ক

শ্রীমঙ্গলের তৈরি পুতুল যাচ্ছে ইউরোপ আমেরিকায়