ইরানে সাম্প্রতিক অস্থিরতা দেশটির শাসনব্যবস্থায় কোনো তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আনতে পারেনি। বিক্ষোভ দমনে ইরানি রাষ্ট্র কঠোর অবস্থান নেয়, যার ফলে পরিস্থিতি ভেনেজুয়েলার মতো অভ্যুত্থানের পথে এগোয়নি। নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অভিযান, ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ রাখা এবং বিক্ষোভের সরাসরি সম্প্রচার সীমিত করার মাধ্যমে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়া কার্যত রুদ্ধ করা হয়। একই সঙ্গে স্যাটেলাইটনির্ভর হাজার হাজার স্টারলিংক ডিভাইস নিষ্ক্রিয় করা হয়।
ইরানের রাজপথে ঠিক কী ঘটেছে—সে বিষয়ে পরস্পরবিরোধী বয়ান রয়েছে। বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর কতজন নিহত হয়েছেন, তা নিয়েও স্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। তবে বিভিন্ন সূত্রের ইঙ্গিত অনুযায়ী, হতাহতের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত বেশি। আগামী কয়েক সপ্তাহে পরিস্থিতি কিছুটা পরিষ্কার হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের জোরালো চাপ সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে কোনো সামরিক হামলা চালায়নি। কেন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা করা হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি পর্যাপ্ত না থাকা কিংবা দ্রুত ও নিরঙ্কুশ বিজয়ের নিশ্চয়তা না পাওয়াই এর অন্যতম কারণ হতে পারে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতাকে প্রায়ই বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গিতে মূল্যায়ন করেন—এমন অভিযোগ নতুন নয়। গত অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়ে তিনি যে দাবি করেছিলেন তিন হাজার বছরের সংঘাতের অবসান ঘটেছে, তা বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেই বিবেচিত হয়। সমালোচকদের মতে, শক্তির একতরফা প্রয়োগকে শান্তি হিসেবে দেখার প্রবণতাই তার দৃষ্টিভঙ্গির মূল সমস্যা।
এ ছাড়া কাতার, সৌদি আরব ও তুরস্কের মতো আঞ্চলিক মিত্ররাও যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছে বলে ধারণা করা হয়। তাদের আশঙ্কা, ইরানে সরাসরি মার্কিন হামলা পরিস্থিতিকে এমন অস্থির ও নিয়ন্ত্রণহীন করে তুলতে পারে, যার পরিণতি গোটা মধ্যপ্রাচ্যের জন্য ভয়াবহ হবে।
তবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক আচরণে অনিশ্চয়তা বরাবরের সঙ্গী। দাভোসে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে হুমকির পর এবার আবার দেখা যাচ্ছে, প্রাথমিক দ্বিধা কাটিয়ে বিপুল মার্কিন সামরিক শক্তি ইরানের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সামরিক হামলার সম্ভাবনা পুরোপুরি বাতিল হয়নি—শুধু সময় পিছিয়েছে।
ভেনেজুয়েলার অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে ট্রাম্প হয়তো ভাবছেন, আরেকটি দ্রুত সামরিক সাফল্য তাকে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু ইরানে শাসন পরিবর্তন ঘটলেও তা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তার জনপ্রিয়তা বাড়াবে—এর কোনো নিশ্চয়তা নেই।
এই উত্তেজনার মধ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি সিদ্ধান্ত নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করার মাধ্যমে ইউরোপ একটি ঝুঁকিপূর্ণ নজির স্থাপন করেছে বলে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন। এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে কূটনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কিছু কট্টরপন্থী গোষ্ঠী যে ভেঙে পড়া ইরানের স্বপ্ন দেখে, তা বর্তমান কঠোর শাসনব্যবস্থার চেয়েও মধ্যপ্রাচ্যের জন্য বেশি বিপজ্জনক হতে পারে। ইরান ভেঙে পড়লে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে, তা ইরাকের বিপর্যয়কেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
সহজে শাসন পরিবর্তনের ধারণাও বাস্তবসম্মত নয়। পাঁচ দশক আগের কোনো রাজবংশে ফিরে যাওয়া কিংবা কার্যত অস্তিত্বহীন বিরোধী শক্তির হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার চিন্তা রাজনৈতিক অন্ধকারে ঝাঁপ দেওয়ার শামিল। ভেনেজুয়েলায় যেভাবে ক্ষমতার ভেতর থেকে বিশ্বাসঘাতকতা দেখা গেছে, ইরানের কঠোর নিরাপত্তা কাঠামোয় তেমন সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
ইরানি নেতৃত্ব যে আবারও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ফাঁদে পড়বে—সেই আশঙ্কাও কম।
ওমানে আলোচনার প্রস্তুতির মধ্যেই ইসরায়েলি হামলার অভিজ্ঞতা তেহরানকে আরও সতর্ক করে তুলেছে। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস হয়েছে—এমন কোনো প্রমাণও এখনো পাওয়া যায়নি।
বর্তমান পরিস্থিতি দুটি বিষয় স্পষ্ট করে। প্রথমত, আগের সামরিক অভিযান কোনোভাবেই চূড়ান্ত ছিল না। দ্বিতীয়ত, ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের কিছু মহল মনে করছে, এখনই তেহরানে শাসন পরিবর্তনের উপযুক্ত সময়। কিন্তু ইতিহাস বলে, ইরান বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে বরাবরই সংবেদনশীল। বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া পরিবর্তন উল্টো ফল দিতে পারে—ইরাক তার বড় উদাহরণ।
সবশেষে প্রশ্ন থেকেই যায়—নব্বই মিলিয়ন মানুষের, দক্ষ জনশক্তি ও বিপুল তেল–গ্যাসসম্পদের দেশ ইরান যদি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ও শক্তিশালী অর্থনীতিতে পরিণত হয়, সেটি কি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য স্বস্তিকর হবে?
রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে যদি ট্রাম্প সত্যিই উদ্বিগ্ন হন, তবে বিদেশি যুদ্ধের চেয়ে দেশের ভেতরের সংকট মোকাবিলা করাই হয়তো তার জন্য বেশি কার্যকর হতে পারে।
সূত্রঃ মিডিল ইস্ট আই
এম.কে

