ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুট হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। ফলে জ্বালানির দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গিয়ে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশ জরুরি পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা ইতোমধ্যে কৌশলগত মজুদ থেকে বিপুল পরিমাণ তেল বাজারে ছাড়লেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সংস্থাটি মানুষকে কম ভ্রমণ করা, ধীরে গাড়ি চালানো এবং অপ্রয়োজনীয় জ্বালানি ব্যবহার কমানোর পরামর্শ দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র, যা ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানে সামরিক হামলা চালিয়েছে, তারা জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানোর পথে হাঁটছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প স্থগিত রেখে তেল ও গ্যাস খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে। তবে সাধারণ জনগণের জন্য সরাসরি কোনো ভর্তুকি বা সহায়তা বাড়ানো হয়নি।
যুক্তরাজ্য সরকার নাগরিকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে এবং সীমিত আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। তবে আগের মতো সার্বজনীন সহায়তা দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি।
অস্ট্রেলিয়া জ্বালানি কর অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে, আর নিউজিল্যান্ড মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য নগদ সহায়তা ঘোষণা করেছে। ইউরোপীয় দেশগুলো একদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর ত্বরান্বিত করার কথা বলছে, অন্যদিকে কিছু দেশ আবার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এশিয়ায় পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি সংকটপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়েছে। শ্রীলঙ্কা জ্বালানি রেশনিং চালু করেছে এবং চারদিনের কর্মসপ্তাহ ঘোষণা করেছে। ভিয়েতনাম কর্মীদের বাসা থেকে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে, আর থাইল্যান্ডে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য পোশাক ও অফিসের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশও কয়লার ব্যবহার বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে পরিবেশগত ঝুঁকিও বাড়ছে।
আফ্রিকার দেশগুলো, যারা অধিকাংশ জ্বালানি আমদানি করে, তারাও বড় ধরনের চাপে পড়েছে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতির কারণে সার উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
দক্ষিণ আমেরিকার কিছু দেশ জ্বালানির দাম বাড়তে দিলেও গণপরিবহনে ভাড়া স্থিতিশীল রাখার মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। ব্রাজিল নিজস্ব উৎপাদিত ইথানল ব্যবহারের মাধ্যমে আংশিকভাবে সংকট মোকাবিলা করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না ঘটে, তবে এই জ্বালানি সংকট দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

