সুইজারল্যান্ডের ইটিএইচ জুরিখের গবেষক দলের সঙ্গে কাজ করে ওষুধ ও ইনসুলিন ছাড়াই রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনাময় একটি প্রযুক্তি তৈরি করেছেন ভারতীয় বিজ্ঞানী দেবাশিস মাইতি। ‘ইকো’ (ইলেকট্রোক্যাটালিটিক ক্লোজড-লুপ হেলথ অপটিমাইজেশন) নামের এই প্রযুক্তিতে শরীরে স্থাপনযোগ্য একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। এটি বিদ্যুতের সাহায্যে অতিরিক্ত গ্লুকোজ ভেঙে অন্য উপাদানে রূপান্তর করতে পারে।
গবেষকদের দাবি, প্রযুক্তিটি ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত এর কার্যকারিতা মূলত পরীক্ষাগার ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ইঁদুরের ওপর পরীক্ষায় দেখা গেছে। মানুষের ক্ষেত্রে এর নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রয়োজন।
গবেষকদের তৈরি যন্ত্রটির মূল অংশে রয়েছে গ্রাফাইটের একটি স্তর, যার ওপর সোনার অতি ক্ষুদ্র কণা এবং আরও ছোট প্লাটিনাম কণা বসানো হয়েছে। তারবিহীন বিদ্যুৎ সরবরাহের মাধ্যমে যন্ত্রটি সক্রিয় করা হয়। এরপর বিশেষ অনুঘটক রক্তের অতিরিক্ত গ্লুকোজকে গ্লুকোনেট নামের একটি উপাদানে রূপান্তর করে। এই প্রক্রিয়ায় গ্লুকোজের একটি অংশ শরীরের স্বাভাবিক বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হওয়া থেকে বিরত থাকে এবং গ্লুকোনেটের বড় অংশ প্রস্রাবের সঙ্গে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়।
যন্ত্রটি রক্তে শর্করার মাত্রা পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহৃত ধারাবাহিক গ্লুকোজ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকবে। শর্করার মাত্রা নির্ধারিত সীমার বেশি হলে সেন্সর থেকে স্মার্টফোন বা স্মার্টওয়াচে সংকেত যাবে। এরপর যন্ত্রটি সক্রিয় হবে। শর্করার মাত্রা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেমে এলে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। যন্ত্রটিতে ১৩ দশমিক ৫৬ মেগাহার্টজ কম্পাঙ্কে তারবিহীন বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে।
গবেষণাগারে পাঁচ লিটার গ্লুকোজযুক্ত দ্রবণে যন্ত্রটির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়েছে। এই পরিমাণ তরল একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে থাকা রক্তের আনুমানিক পরিমাণের সমান। পরীক্ষায় যন্ত্রটি গ্লুকোজ রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছে।
এ ছাড়া ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ইঁদুরের ওপর পরীক্ষায় রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাফল্য পাওয়া গেছে। ছয় সপ্তাহের পরীক্ষায় ইঁদুরগুলোর ওজনও কমেছে। গবেষকেরা জানিয়েছেন, এ সময়ে যন্ত্রটি ভালোভাবে কাজ করেছে এবং পরীক্ষায় যন্ত্রের কারণে টিস্যুর ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
গবেষণাটির ফলাফল ডায়াবেটিস চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও প্রযুক্তিটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। মানুষের শরীরে যন্ত্রটির নিরাপত্তা, কার্যকারিতা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব যাচাই করা হয়নি। মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে যন্ত্রটির নকশা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নসহ আরও গবেষণা প্রয়োজন।
গবেষণাটি ২০২৬ সালের ২২ অক্টোবর বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষক দলের নেতৃত্বে ছিলেন ইটিএইচ জুরিখের অধ্যাপক মার্টিন ফুসেনেগার। ভারতীয় বিজ্ঞানী দেবাশিস মাইতি গবেষণাটির সহলেখকদের একজন।
সূত্রঃ ইটিএইচ জুরিখ
এমকে

