বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দেশ সফরকারী রাজা-রানীদের একজন ছিলেন ব্রিটেনের প্রয়াত রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ। ৭০ বছরের শাসনামলে তিনি বিশ্বের ১২০টি দেশ সফর করলেও, একটি দেশ কখনোই তার সফরসূচিতে স্থান পায়নি—সেটি হলো আর্জেন্টিনা। এর পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ, কূটনৈতিক উত্তেজনা এবং ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সংঘাত।
সম্প্রতি প্রকাশিত ঐতিহাসিক সরকারি নথি অনুযায়ী, ১৯৬৮ সালে দক্ষিণ আমেরিকা সফরের অংশ হিসেবে রানীর আর্জেন্টিনা সফরের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ওই সফরে তিনি ব্রাজিল ও চিলি সফর করলেও, শেষ মুহূর্তে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড উইলসনের লেবার সরকার আর্জেন্টিনা সফর বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করেছিলেন, রানীর আর্জেন্টিনা সফর ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব নিয়ে চলমান বিরোধকে আরও জটিল করে তুলতে পারে এবং রাজতন্ত্রকে সরাসরি কূটনৈতিক সংকটে জড়িয়ে ফেলতে পারে। তাই প্রকৃত কারণ গোপন রেখে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়, সফরসূচির অসুবিধার কারণেই আর্জেন্টিনা সফর বাতিল করা হয়েছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে ১৯৮২ সালে, যখন আর্জেন্টিনার সামরিক জান্তা ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে আক্রমণ চালায়। এর পর শুরু হয় ফকল্যান্ড যুদ্ধ। কয়েক সপ্তাহের সংঘর্ষের পর ব্রিটেন দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করে। যুদ্ধের পর দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘ সময় ধরে উত্তেজনাপূর্ণ থাকায় রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের জন্য আর্জেন্টিনা সফর রাজনৈতিকভাবে কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে।
তবে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা পুরোপুরি থেমে থাকেনি। রানী নিজে কখনো আর্জেন্টিনা না গেলেও, পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ রাজপরিবারের বিভিন্ন সদস্যকে কূটনৈতিক সফরে দেশটিতে পাঠানো হয়।
১৯৯৪ সালে প্রিন্স অ্যান্ড্রু যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে প্রথম রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে আর্জেন্টিনা সফর করেন। এরপর ১৯৯৫ সালে প্রিন্সেস ডায়ানা চার দিনের মানবিক সফরে বুয়েনোস আইরেস গিয়ে সাধারণ মানুষের প্রশংসা কুড়ান এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট কার্লোস মেনেমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
১৯৯৯ সালে তৎকালীন প্রিন্স চার্লসের সফরকে দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সফরকালে তিনি ১৯৮২ সালের যুদ্ধে নিহত আর্জেন্টাইন সেনাদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন এবং একটি পোলো ম্যাচেও অংশ নেন। পরে ২০১৩ সালে প্রিন্সেস অ্যান আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির বৈঠকে অংশ নিতে আর্জেন্টিনা সফর করলেও, তার সফরের সময় ব্রিটিশবিরোধী বিক্ষোভের মুখোমুখি হতে হয়।
এদিকে, ইতিহাসের এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের আবহেই ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে মুখোমুখি হয়েছে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি ফুটবল মাঠেও দুই দেশের এই লড়াই বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আগ্রহের জন্ম দিয়েছে।
সূত্রঃ জিবি নিউজ
এম.কে

