ভবিষ্যৎ যুদ্ধের জন্য পারমাণবিক শক্তিচালিত ভারী ট্যাংক তৈরির সম্ভাব্য প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করেছেন চীনের প্রতিরক্ষা গবেষকেরা। প্রস্তাবিত নকশায় থাকবে উচ্চক্ষমতার ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক রেলগান, উন্নত শক্তি সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং শেষ ধাপে একটি ছোট মডুলার পারমাণবিক চুল্লি।
চীনের প্রতিরক্ষা বিষয়ক জার্নাল অ্যাক্টা আর্মামেন্টারি-এর ২০২৬ সালের জুন সংখ্যায় প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে এই ধারণা তুলে ধরা হয়েছে বলে জানিয়েছে মিলিটারি ওয়াচ ম্যাগাজিন। গবেষণাটি করেছে ইনার মঙ্গোলিয়া ফার্স্ট মেশিনারি গ্রুপ, স্টেট কি ল্যাবরেটরি অব স্পেশাল ভেহিকেল ডিজাইন অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্টিগ্রেশন টেকনোলজি এবং বেইজিং ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গবেষকেরা।
গবেষণায় প্রস্তাবিত ট্যাংকটির ওজন প্রায় ৬০ টন এবং এর উন্নয়নের সম্ভাব্য সময়সীমা ২০৪৫ সালের পর পর্যন্ত বিবেচনা করা হয়েছে। তবে এটি বর্তমানে সামরিক বাহিনীতে ব্যবহৃত কোনো অস্ত্রব্যবস্থা নয়; বরং ভবিষ্যৎ সাঁজোয়া যানের সম্ভাব্য প্রযুক্তি নিয়ে একটি গবেষণামূলক ধারণা।
গবেষকেরা সম্ভাব্য প্রযুক্তিটির উন্নয়নকে তিনটি ধাপে ভাগ করেছেন। প্রথম পর্যায়ে প্রচলিত ডিজেল ইঞ্জিন ব্যবহার করেই ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক অস্ত্র সংযুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রথম ধাপে প্রায় ১ হাজার ৫০০ হর্সপাওয়ারের ডিজেল জেনারেটরের সঙ্গে সুপারক্যাপাসিটর ও ফ্লাইহুইলভিত্তিক শক্তি সংরক্ষণ ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হবে রেলগানের মতো অস্ত্র চালানোর সময় অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা।
এই পর্যায়ে প্রায় ১০ মেগাজুল শক্তির ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক গান ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, এর সম্ভাব্য পাল্লা প্রায় ১৫০ কিলোমিটার হতে পারে। একই সঙ্গে ট্যাংকের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অংশ হিসেবে প্রায় ২ মেগাজুল শক্তির একটি ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক আর্মারের ধারণাও দেওয়া হয়েছে।
পরবর্তী ধাপে, যা ২০৪৫ সাল পর্যন্ত উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে, রেলগানের শক্তি বাড়িয়ে প্রায় ২০ মেগাজুল করার প্রস্তাব রয়েছে। এর সম্ভাব্য পাল্লা প্রায় ৩০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে বলে গবেষণায় ধারণা করা হয়েছে।
এ পর্যায়ে প্রায় ২ হাজার হর্সপাওয়ারের ডিজেল জেনারেটর ব্যবহারের পাশাপাশি প্রায় ৫ টন ওজনের উন্নত শক্তি সংরক্ষণ সরঞ্জাম যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থার শক্তিও বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।
গবেষণার সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী ধাপ হলো ট্যাংকে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার। এ পর্যায়ে তরল ধাতু দিয়ে শীতল করা প্রায় ১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ছোট মডুলার রিঅ্যাক্টর ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
গবেষকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পুরো রিঅ্যাক্টর ব্যবস্থা প্রায় ২ ঘনমিটার জায়গার মধ্যে স্থাপন করা হতে পারে। এই শক্তির উৎস থেকে রেলগানসহ ট্যাংকের অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জামে দীর্ঘসময় বিদ্যুৎ সরবরাহ করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
এই চূড়ান্ত নকশায় ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক রেলগানের শক্তি প্রায় ৫০ মেগাজুল করার প্রস্তাব রয়েছে। গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, গোলার গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার এবং সম্ভাব্য সর্বোচ্চ পাল্লা প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার হতে পারে।
তবে এগুলো গবেষণায় উপস্থাপিত সম্ভাব্য প্রযুক্তিগত সক্ষমতার হিসাব—বাস্তবে এমন ট্যাংক তৈরি হয়েছে বা এই পাল্লায় সফলভাবে হামলা চালিয়েছে, এমন তথ্য প্রতিবেদনে নেই।
গবেষণার মূল বিষয় শুধু একটি শক্তিশালী কামান তৈরি করা নয়। ভবিষ্যতের সাঁজোয়া যানগুলোতে বৈদ্যুতিক শক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সংরক্ষণ করা যায়, সেটিই গবেষণার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
গবেষণাপত্রে সুপারক্যাপাসিটর, ফ্লাইহুইল, উন্নত ব্যাটারি, সুপারকন্ডাক্টিং শক্তি সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং সমন্বিত যানবাহন মাইক্রোগ্রিডের মতো প্রযুক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে ভবিষ্যতে শক্তিশালী ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক অস্ত্র, সক্রিয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অন্যান্য উচ্চবিদ্যুৎ-নির্ভর সামরিক সরঞ্জাম পরিচালনার সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা করা হয়েছে।
পারমাণবিক শক্তিচালিত ট্যাংকের ধারণা প্রযুক্তিগতভাবে আকর্ষণীয় হলেও এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। একটি ছোট সামরিক যান বা ট্যাংকের মধ্যে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন করলে নিরাপত্তা, ওজন, রক্ষণাবেক্ষণ, বিকিরণ সুরক্ষা, খরচ এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিসহ বহু বিষয় সামনে আসবে।
এ ছাড়া আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ভারী ট্যাংকের পাশাপাশি চালকবিহীন যান, ড্রোন, সেন্সর এবং নেটওয়ার্কভিত্তিক যুদ্ধব্যবস্থার গুরুত্ব বাড়ছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতাতেও ড্রোন ও বিভিন্ন নেটওয়ার্কভিত্তিক ব্যবস্থার ব্যবহার যুদ্ধক্ষেত্রের কৌশলে বড় পরিবর্তন এনেছে। ফলে ভবিষ্যতের সাঁজোয়া যানে শুধু কামানের পাল্লা বাড়ানো নয়, বরং পরিস্থিতি শনাক্ত করা, দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান, ড্রোনের সঙ্গে সমন্বয় এবং সক্রিয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিয়েও গুরুত্ব বাড়ছে।
সূত্রঃ অ্যাক্টা আর্মামেন্টারি
এমকে

