ইংল্যান্ডে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত বিপুলসংখ্যক মানুষ জানেনই না যে তারা এই রোগে ভুগছেন। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশটিতে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত মানুষের ৫৯ শতাংশেরই রোগটি শনাক্ত হয়নি। ফলে তাদের স্ট্রোক, হৃদরোগ আক্রান্ত হওয়া এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের পরিচালিত এ গবেষণায় প্রায় ১৪ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণাটি উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ইংল্যান্ডের বর্তমান ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
গবেষণায় দেখা যায়, ইংল্যান্ডের প্রাপ্তবয়স্কদের ৩৭ শতাংশের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় ছয়জনের চারজনই নিজেদের উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি জানেন না।
উচ্চ রক্তচাপের সংজ্ঞা হিসেবে গবেষণায় ১৪০/৯০ মিলিমিটার পারদচাপ বা তার বেশি রক্তচাপকে ধরা হয়েছে। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ‘আওয়ার ফিউচার হেলথ’ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের তথ্য ব্যবহার করে গবেষণাটি করা হয়।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, উচ্চ রক্তচাপ পুরুষদের মধ্যে নারীদের তুলনায় বেশি। সব বয়সী মানুষের হিসাবে পুরুষদের ৪২ শতাংশের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, যেখানে নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ২৯ শতাংশ। বয়স্কদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের প্রবণতাও বেশি পাওয়া গেছে।
উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ২০০০-এর দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও প্রায় ২০১১ সালের পর সেই অগ্রগতি থেমে যায় বলে গবেষকরা জানিয়েছেন। কোভিড-১৯ মহামারির পর পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, মহামারির সময় স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এর একটি কারণ হতে পারে।
গবেষণার প্রধান লেখক ও অক্সফোর্ড পপুলেশন হেলথের চিকিৎসা পরিসংখ্যানবিদ ওয়েনইউ লিউ বলেন, উচ্চ রক্তচাপ অনেক সময় কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই শরীরে ক্ষতি করে। তাই এটি শনাক্ত ও চিকিৎসার বর্তমান পদ্ধতি আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। তিনি সবার জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদারের পাশাপাশি হৃদ্রোগের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে চিকিৎসা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
তবে শুধু রোগ শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়—চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের একটি বড় অংশের রক্তচাপও নিয়ন্ত্রণে নেই। গবেষণায় দেখা গেছে, জিপির মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা নেওয়া প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ৫০ শতাংশের রক্তচাপ এখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
‘আওয়ার ফিউচার হেলথ’-এর উপপ্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা এবং অক্সফোর্ড পপুলেশন হেলথের গবেষক ডা. ইয়ান টার্নবুল বলেন, কেন ওষুধ গ্রহণের কথা জানানো রোগীদের অর্ধেকের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে নেই, তার একক কোনো কারণ নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
তার মতে, কারও কারও ক্ষেত্রে ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন করা বা একাধিক ওষুধ ব্যবহার করার প্রয়োজন হতে পারে। অন্য রোগ, ব্যবহৃত অন্যান্য ওষুধ, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, জটিল চিকিৎসা পদ্ধতি এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা চাপও নিয়মিত ওষুধ গ্রহণে বাধা তৈরি করতে পারে।
এ ছাড়া ওজন, খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, মদ্যপান ও শারীরিক কর্মকাণ্ডের মাত্রাও রক্তচাপের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে কোনো ব্যক্তির রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকার বিষয়টিকে শুধু রোগী বা চিকিৎসকের ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।
গবেষকরা অবশ্য কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও জানিয়েছেন। যেমন, গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা যে রক্তচাপ কমানোর ওষুধ গ্রহণ করছেন বলে জানিয়েছেন, তা প্রেসক্রিপশন সংক্রান্ত নথি দিয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। আবার একদিনের রক্তচাপের মাপ একজন ব্যক্তির স্বাভাবিক রক্তচাপের পুরো চিত্রও তুলে ধরে না।
ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশনের প্রধান বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসা কর্মকর্তা অধ্যাপক ব্রায়ান উইলিয়ামস বলেন, গবেষণাটি যুক্তরাজ্যে শনাক্ত না হওয়া উচ্চ রক্তচাপের ব্যাপকতা এবং চিকিৎসাধীন রোগীদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার চ্যালেঞ্জের একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে।
তিনি বলেন, উচ্চ রক্তচাপ দ্রুত শনাক্ত করা এবং কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রতিরোধযোগ্য হৃদরোগ ও স্ট্রোক থেকে রক্ষা পেতে পারেন। এ জন্য ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে শনাক্ত, চিকিৎসা ও নিয়মিত সহায়তা দেওয়ার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার প্রয়োজন রয়েছে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এমকে

