মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাবে যুক্তরাজ্যে বাড়তে থাকা জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে ব্রিটিশ সরকার।
দেশটির অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভস সুপারমার্কেটগুলোকে রুটি, ডিম, দুধসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের মূল্যসীমা নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের দাম সীমিত রাখলে খুচরা বিক্রেতাদের ওপর থাকা কিছু সরকারি বিধিনিষেধ শিথিল করা হতে পারে।
জানা গেছে, প্রায় ২০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের একটি তালিকা তৈরি করে সেগুলোর মূল্য নিয়ন্ত্রণের চিন্তা করছে ব্রিটিশ ট্রেজারি। এর বিনিময়ে পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং নীতির কিছু ব্যয় কমানো এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্য বিক্রির ওপর আরোপিত কিছু নতুন নিয়ম স্থগিত রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে কয়েকটি বড় মুদি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা করেছেন বলেও জানা গেছে।
তবে সরকারের এই পরিকল্পনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে খুচরা ব্যবসা খাত। অনেক ব্যবসায়ী এটিকে “হতাশাগ্রস্ত উদ্যোগ” বলে মন্তব্য করেছেন। একাধিক সুপারমার্কেট সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অভিযোগ করেন, সরকার বাজার ব্যবস্থার বাস্তবতা ভুলে গিয়ে সরাসরি মূল্যনিয়ন্ত্রণের পথে হাঁটছে। তাদের মতে, এ ধরনের নীতি অতীতে ব্যর্থ হয়েছিল এবং এটি ব্যবসা ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমানে ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালীর অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সার ও খাদ্যপণ্য পরিবহনে বিঘ্ন ঘটায় ভবিষ্যতে খাদ্যমূল্য আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যদিও সম্প্রতি খাদ্য ও পানীয় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছিল, তবুও নতুন সংকটের কারণে বাজার আবার অস্থির হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
বিরোধীদলীয় ব্যবসাবিষয়ক মুখপাত্র অ্যান্ড্রু গ্রিফিথ সরকারের এই উদ্যোগকে “অর্থনৈতিক অজ্ঞতার পরিচয়” বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, সরকারের ভুল নীতির কারণেই মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, এখন সেই দায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ট্রেজারি মন্ত্রী ড্যান টমলিনসন দাবি করেছেন, সরকার এখনই বাধ্যতামূলক মূল্যসীমা আরোপের সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি বিবেচনায় এমন পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
এরই মধ্যে অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে প্রতিযোগিতা ও বাজার নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে নতুন ক্ষমতা দেওয়ার পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছে সরকার। সংকটের সুযোগ নিয়ে অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়ানো প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম প্রকাশ করা এবং প্রয়োজনে জরিমানা করার ব্যবস্থাও রাখা হতে পারে। র্যাচেল রিভস বলেন, বৈশ্বিক সংকটের ধাক্কা সবচেয়ে বেশি পড়ে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের ওপর, তাই সংকটকে পুঁজি করে অতিরিক্ত মুনাফা করার সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না।
এদিকে ব্রিটিশ রিটেইল কনসোর্টিয়ামের প্রধান নির্বাহী হেলেন ডিকিনসন বলেছেন, যুক্তরাজ্যে পশ্চিম ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে কম দামে খাদ্যপণ্য পাওয়া যায় সুপারমার্কেটগুলোর তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে। তার মতে, সরকারের উচিত মূল্যনিয়ন্ত্রণের বদলে জ্বালানি ব্যয় ও ব্যবসায়িক কর কমিয়ে বাজারকে সহায়তা করা।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, মূল্যসীমা কার্যকর হলে সুপারমার্কেটগুলো কমদামি বিদেশি খাদ্যপণ্যের দিকে ঝুঁকতে পারে, যার ফলে ব্রিটিশ কৃষকরা বড় ক্ষতির মুখে পড়বেন। এতে দেশের খাদ্যনিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্কটল্যান্ডের ক্ষমতাসীন স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টিও এর আগে ৫০টি খাদ্যপণ্যের মূল্যসীমা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে সেই পরিকল্পনা নিয়েও ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। স্কটল্যান্ডের মুখ্যমন্ত্রী জন সোয়েনি দাবি করেছেন, কৃষক ও সরবরাহকারীদের ক্ষতি না করেই এমন নীতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
খুচরা বিক্রেতারা আরও অভিযোগ করেছেন, বর্তমান সরকারের অধীনে জাতীয় বিমা অবদান বৃদ্ধি, ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো এবং ব্যবসায়িক কর বৃদ্ধির কারণে তাদের পরিচালন ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ফলে বাজারে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে উল্টো নতুন চাপ তৈরি হচ্ছে।
খুচরা বাজার বিশ্লেষক ক্লাইভ ব্ল্যাক বলেন, ইতিহাসে খাদ্যপণ্যের মূল্যসীমা খুব কম ক্ষেত্রেই সফল হয়েছে। তাঁর মতে, এ ধরনের নীতির ফলে বাজারে পণ্যের সংকট, নিম্নমানের সরবরাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

