কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে প্রাকৃতিক গ্যাসের সম্ভাব্য নতুন মজুতের সন্ধান বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। গভীর নলকূপ খননের স্থান থেকে টানা চার দিন ধরে গ্যাস নির্গমন ও আগুন জ্বলার ঘটনায় সংগৃহীত নমুনা ও আলামত পর্যবেক্ষণ করে উচ্চমাত্রার হাইড্রোকার্বন এবং কনডেনসেটের উপস্থিতির আভাস পেয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)। প্রাথমিক ভূতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণে সেখানে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত থাকার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। সব পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বিষয়টি নিশ্চিত হলে ইনানী হতে পারে বাংলাদেশের ৩১তম গ্যাসক্ষেত্র।
গত ২৭ অক্টোবর সকাল থেকে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ইনানী ছোট ব্রিজসংলগ্ন একটি বাড়িতে গভীর নলকূপ খননের স্থান থেকে গ্যাস বের হয়ে আগুন জ্বলছে। চার দিন পার হলেও আগুন নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বরং গ্যাসের নির্গমন ও আগুনের তীব্রতা অব্যাহত থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাপেক্সের ব্যবস্থাপক ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এসএম নাফিকুন আরহামের পর্যবেক্ষণে ইনানীর গ্যাসের সঙ্গে কনডেনসেটের উপস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তার মতে, এটি সাধারণ অগভীর স্তরে পাওয়া গ্যাসের মতো নয়। কারণ ভোলার শাহবাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অগভীর স্তরে পাওয়া বায়োজেনিক গ্যাসের সঙ্গে সাধারণত পানি উঠে আসে। কিন্তু ইনানীতে নির্গত গ্যাসের সঙ্গে কনডেনসেট পাওয়া যাচ্ছে, যা ভূগর্ভে উচ্চমাত্রার হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতির ইঙ্গিত দিতে পারে।
কনডেনসেট হলো প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্গে ভূগর্ভে পাওয়া মূল্যবান হালকা তরল পেট্রোলিয়ামজাত পদার্থ। জ্বালানি খাতে এর বাণিজ্যিক গুরুত্ব রয়েছে। তাই ইনানীতে কনডেনসেটের উপস্থিতির প্রাথমিক আলামতকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ভূতাত্ত্বিকরা।
বাপেক্সের ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান জানিয়েছেন, প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে নলকূপ খননের সময় গ্যাসের স্তরের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর উচ্চচাপের গ্যাস বিভিন্ন ফাটল ও দুর্বল স্তর দিয়ে ভূ-পৃষ্ঠে উঠে আসতে পারে। পরে কোনো উৎস থেকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের সংস্পর্শে এসে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূগর্ভে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপের প্রভাবে জৈব পদার্থ থেকে যে গ্যাস তৈরি হয়, তাকে থার্মোজেনিক গ্যাস বলা হয়। সাধারণত গভীর ভূস্তরের গ্যাসক্ষেত্রে এ ধরনের গ্যাস পাওয়া যায়। অন্যদিকে অগভীর স্তরে অণুজীবের মাধ্যমে জৈব পদার্থ ভেঙে বায়োজেনিক গ্যাস তৈরি হয়। ইনানীর গ্যাসের সঙ্গে কনডেনসেটের উপস্থিতি থাকায় এর উৎস ও প্রকৃতি নিয়ে নতুন করে অনুসন্ধানের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে বাপেক্সের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা থেকে গিয়ে মঙ্গলবার রাতে ও বুধবার বিকেলে বিভিন্ন নমুনা ও আলামত সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠিয়েছে। তবে গ্যাসের প্রবাহ ও তীব্রতা বেশি থাকায় সরাসরি গ্যাসের নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। পরীক্ষাগারে নমুনা বিশ্লেষণ এবং পরবর্তী ভূতাত্ত্বিক জরিপের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া যাবে, সেখানে কী ধরনের গ্যাস রয়েছে এবং এর প্রকৃত মজুত কতটুকু।
এদিকে গ্যাস নির্গমনের পাশাপাশি আগুনের তীব্রতা বাড়তে থাকায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি শামসুল আলম জানিয়েছেন, আগুনের পাশাপাশি মাঝেমধ্যে বিস্ফোরণের মতো শব্দ শোনা যাচ্ছে। আশপাশের কিছু স্থানে মাটিও সরে যাচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজারের সিনিয়র স্টেশন অফিসার দোলন আচার্য্য বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে আগুন জ্বলতে থাকায় এলাকায় বিস্ফোরণ ও ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিসের দুটি দল সার্বক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালন করবে।
নিরাপত্তার স্বার্থে প্রশাসন ঘটনাস্থলের চারপাশে ২০০ মিটার এলাকাজুড়ে নিরাপত্তাবলয় তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার জানিয়েছেন, সেখানে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘিরে ফেলা হচ্ছে এবং সতর্কতামূলক লাল পতাকা টাঙানো হয়েছে। ঝুঁকি এড়াতে ইনানী এলজিইডি সড়কটিও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। বিকল্প পথে চলাচলের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে স্থানীয়দের।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান জানিয়েছেন, ছোট ইনানীর ছোট খাল এলাকায় গ্যাস নির্গমনের স্থান ও আশপাশে যেকোনো সময় বিস্ফোরণ কিংবা ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের নিরাপদ দূরত্বে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা এবং আবাসিক খাতে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। দেশের নিজস্ব গ্যাসের মজুতের ওপর চাপ এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির ব্যয় বিবেচনায় নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হলে তা জাতীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ইনানীতে যদি বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত নিশ্চিত হয়, তাহলে দেশের জ্বালানি সরবরাহে নতুন উৎস যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। পাশাপাশি কনডেনসেটের উপস্থিতি নিশ্চিত হলে তা থেকেও অর্থনৈতিক মূল্য পাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। এতে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এখনই ইনানীকে আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্র ঘোষণা করার সুযোগ নেই। গ্যাসের প্রকৃতি, উৎস, চাপ, ভূগর্ভস্থ অবস্থান এবং উত্তোলনযোগ্য মজুত নির্ধারণে পরীক্ষাগার বিশ্লেষণ ও বিস্তারিত অনুসন্ধান প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে ইনানীতে উচ্চমাত্রার হাইড্রোকার্বন ও কনডেনসেটের প্রাথমিক উপস্থিতি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে একটি সম্ভাবনাময় খবর। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দ্রুত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করা, গ্যাসের নির্গমন নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। প্রাথমিক আভাস যদি শেষ পর্যন্ত বাস্তব গ্যাসক্ষেত্রের আবিষ্কারে পরিণত হয়, তাহলে তা দেশের জ্বালানি খাতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।
সূত্রঃ বাপেক্সের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসন\দৈনিক ইনকিলাব
এমকে

