11.5 C
London
February 20, 2026
TV3 BANGLA
বাংলাদেশ

নির্বাচনের তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিঃ শুল্ক কমলেও শর্তে ঘেরা বাংলাদেশ

৯ ফেব্রুয়ারি মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে। জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে, গোপনীয়তা বজায় রেখে এই চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সরকার বলছে, যুক্তরাষ্ট্র আরোপিত পারস্পরিক শুল্ক হ্রাসের মাধ্যমে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার সুরক্ষিত হবে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সামান্য শুল্কছাড়ের বিপরীতে বিস্তৃত শর্তে আবদ্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

 

চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর আরোপিত পারস্পরিক শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিদ্যমান গড় সাধারণ শুল্কহার ১৫.৫ শতাংশ বহাল রয়েছে। এর সঙ্গে অতিরিক্ত ১৯ শতাংশ যুক্ত হওয়ায় মোট শুল্কভার দাঁড়াচ্ছে ৩৪.৫ শতাংশে। ফলে কার্যত শুল্ক বোঝা খুব একটা কমেনি—এমন মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ।

বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ৬,৭১০টি পণ্যে শুল্কছাড় দেবে, বিপরীতে সুবিধা পাবে ১,৬৩৮টি পণ্যে। এর মধ্যে ৪,৫০০ মার্কিন পণ্য চুক্তি কার্যকর হওয়ার দিন থেকেই শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। পশুসম্পদ, মাংস, মাছ, রাসায়নিক দ্রব্য, বস্ত্র, যন্ত্রপাতি ও শিল্পপণ্য এ তালিকায় রয়েছে। আরও ১,৫৩৯টি পণ্যের শুল্ক ধাপে ধাপে পাঁচ বছরে এবং ৬৭২টি পণ্যের শুল্ক দশ বছরে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হবে। এই ব্যাপক শুল্কছাড় দেশীয় কৃষি ও শিল্প খাতকে কঠিন প্রতিযোগিতায় ফেলতে পারে এবং সরকারের রাজস্ব আয় কমাতে পারে।

চুক্তিতে অশুল্ক বাধা অপসারণের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে অনুমোদিত চিকিৎসা ও শিল্পপণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত পরীক্ষা ও বাজারজাত অনুমোদন প্রক্রিয়া শিথিল করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের সনদ, মোটরযান নিরাপত্তা ও নির্গমন মান এবং পুনঃপ্রস্তুত পণ্যের আমদানি বিধিনিষেধ শিথিলের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কৃষি ও জৈবপ্রযুক্তি পণ্যের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড স্বীকৃতি দিতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত পরীক্ষা বা লেবেল ছাড়া আমদানি অনুমোদনের নীতি প্রণয়ন করতে হবে। সমালোচকদের মতে, এতে খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নির্দিষ্ট পণ্য বাধ্যতামূলক আমদানির প্রতিশ্রুতি। বাংলাদেশকে বোয়িং থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কিনতে হবে। আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি, বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, এবং ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য আমদানির অঙ্গীকার করা হয়েছে। পাঁচ বছর ধরে প্রতিবছর ৭ লাখ টন গম এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ সয়াবিন ক্রয়ের শর্তও রয়েছে। পাশাপাশি সামরিক সরঞ্জাম আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এতে আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

বিনিয়োগ ও শিল্পনীতির ক্ষেত্রেও চুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে। খনিজ সম্পদ আহরণ, জ্বালানি, টেলিযোগাযোগ, পরিবহন ও অবকাঠামো খাতে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সমান সুযোগ দিতে হবে। তেল, গ্যাস, বীমা ও টেলিযোগাযোগ খাতে মার্কিন মূলধনে সীমা আরোপ করা যাবে না। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে ভর্তুকি ও অ-বাণিজ্যিক সহায়তা সীমিত করতে হবে এবং ভর্তুকি সংক্রান্ত তথ্য বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় জমা দিতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে দেশীয় শিল্প সুরক্ষা ও কৌশলগত খাতে নীতিগত স্বাধীনতা কমতে পারে।

চুক্তিতে জাতীয় নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো বাণিজ্যিক বা সীমান্ত ব্যবস্থা নিলে বাংলাদেশকে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইন মানা, নির্দিষ্ট প্রযুক্তি গ্রহণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী বিবেচিত দেশের সঙ্গে কিছু বাণিজ্যিক বা প্রযুক্তিগত চুক্তিতে বিধিনিষেধ আরোপের শর্ত রয়েছে। এর ফলে বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হতে পারে।

এছাড়া তৃতীয় দেশের সঙ্গে ডিজিটাল বাণিজ্য বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে অ-বাজারভিত্তিক দেশের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তি হলে, যা এই সমঝোতার পরিপন্থী, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি বাতিল করে পুনরায় শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করতে পারবে।
চুক্তির ৬.৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সব আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার ৬০ দিন পর এটি কার্যকর হবে।

সরকার বলছে, রপ্তানি বাজার রক্ষায় এটি একটি বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ। তবে সমালোচকরা মনে করছেন, সামান্য শুল্কছাড়ের বিনিময়ে অর্থনীতি, বাণিজ্য ও পররাষ্ট্রনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে এমন বিস্তৃত অঙ্গীকার করা হয়েছে। এখন নজর নবনির্বাচিত সরকারের অবস্থানের দিকে—জাতীয় সংসদে আলোচনার মাধ্যমে চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে কি না, সেটিই দেখার বিষয়।

সূত্রঃ ডেইলি স্টার

এম.কে

আরো পড়ুন

পাপনের পদত্যাগ, বিসিবির নতুন সভাপতি ফারুক আহমেদ

ভারতে গিয়ে হাসিনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চায় স্বাধীন তদন্ত কমিশন

অপহৃত বাংলাদেশি জাতিসংঘ কর্মীর ভিডিও প্রকাশ করল আল কায়েদা