গাজায় ফিলিস্তিনিদের হত্যার আহ্বান জানিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির। তার বক্তব্যের পর জার্মানির রাজনৈতিক দল, ইহুদি ও খ্রিষ্টান ধর্মীয় সংগঠনসহ বিভিন্ন মহল থেকে নিন্দা জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে বেন-গভিরের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার দাবিও জোরালো হয়েছে।
সম্প্রতি এক বক্তব্যে বেন-গভির গাজায় ‘সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্য করে’ হত্যাকাণ্ড চালানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, প্রতি রাতে ৩০ থেকে ৪০ জন ফিলিস্তিনিকে ‘সরিয়ে ফেলা’ উচিত। তার বক্তব্যে শুধু সশস্ত্র ফিলিস্তিনিদের নয়, গাজায় থাকা এমন মানুষদেরও লক্ষ্য করার কথা উঠে আসে, যাদের বেঁচে থাকা উচিত নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বেন-গভিরের এই বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস। বুধবার দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, এ ধরনের বক্তব্য আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ম্যার্ৎসের মুখপাত্র জানান, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলের বসতি সম্প্রসারণের গতি বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েও চ্যান্সেলর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে গাজায় ইসরাইলের নতুন করে ভূখণ্ড দখলের কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
জার্মান চ্যান্সেলরের মতে, দখলদার শক্তি হিসেবে ইসরাইলকে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করতে হবে। তাদের সম্পত্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গাজায় জনপ্রশাসন ও মানবিক সহায়তা চালু রাখার বিষয়েও তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।
বেন-গভিরের বক্তব্যের এক দিন আগেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন জার্মানির অর্থমন্ত্রী ও চ্যান্সেলরের ডেপুটি লার্স ক্লিংবাইল। তিনি বলেন, জার্মান সরকার কোনোভাবেই এ ধরনের বক্তব্য মেনে নিতে পারে না।
ক্লিংবাইল জানান, বেন-গভিরকে ইউরোপীয় পর্যায়ে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতি জার্মানির পূর্ণ সংহতি থাকলেও এ ধরনের বক্তব্যের ক্ষেত্রে নীরব থাকার সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, এবার এমন একটি সীমা অতিক্রম করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টে জার্মানির রক্ষণশীল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়নের সদস্য হিল্ডগার্ড বেন্টেলেও বেন-গভিরের ওপর নিষেধাজ্ঞার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তার মতে, ইউরোপে কোনো ব্যক্তিকে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো কারণে নির্মূল বা নিশ্চিহ্ন করতে চাওয়া সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।
জার্মানির বিরোধী দল গ্রিন পার্টিও বেন-গভিরের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে। দলটির নেত্রী ফ্রান্সিসকা ব্রান্টনার বেন-গভিরের জার্মানিতে প্রবেশ নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ইউরোপীয় পর্যায়েও নিষেধাজ্ঞা আরোপের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
ব্রান্টনার বলেন, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দেওয়ার মতো বক্তব্য বেন-গভিরের জন্য নতুন নয়। অতীতেও তিনি এমন বক্তব্য দিয়েছেন। তাই যেসব দেশ ইতোমধ্যে তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, জার্মানিরও তাদের অনুসরণ করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জার্মানির লেফট পার্টিও বেন-গভিরের বক্তব্যের নিন্দা জানিয়েছে। দলটির নেতা লেয়া রাইজনার ইসরাইলি মন্ত্রীর পাশাপাশি ইসরাইল সরকারের বিরুদ্ধেও কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ইসরাইলে সব ধরনের অস্ত্র রপ্তানি বন্ধের দাবি তুলেছেন তিনি।
বেন-গভিরের মন্তব্যের নিন্দা জানিয়েছে জার্মানির ইহুদিদের কেন্দ্রীয় পরিষদও। সংগঠনটির সভাপতি ইয়োসেফ শুস্টার বলেন, এই বক্তব্য ইহুদি মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থি এবং এর ফলে ইসরাইলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।
শুস্টার বেন-গভিরের আচরণকে ‘অত্যন্ত লজ্জাজনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, এ ঘটনা উগ্র ডানপন্থি শক্তিগুলোর বিপজ্জনক রূপও তুলে ধরেছে।
জার্মানির প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চ কাউন্সিলের চেয়ারপার্সন কার্স্টেন ফেয়াহ্রসও মন্তব্যটির তীব্র সমালোচনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বেন-গভিরের বক্তব্যকে ‘মানবতার ওপর আঘাত’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা রয়েছে এবং এই বিশ্বাস সব ধর্মের মানুষের মধ্যে থাকা প্রয়োজন।
আমার দেশের প্রতিবেদনে ডয়চে ভেলের বরাতে বলা হয়েছে, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে ও নেদারল্যান্ডসসহ কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে বেন-গভিরের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এসব নিষেধাজ্ঞার কারণে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে তার প্রবেশে বাধা রয়েছে।
জার্মানির বুন্ডেস্টাগে রক্ষণশীল সংসদীয় দলের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক মুখপাত্র ইয়ুর্গেন হাডর্টও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে বেন-গভিরের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, মানবিক মর্যাদা ও মানবাধিকারের সর্বজনীন স্বীকৃতির বার্তা দিতে ইইউর এমন পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
হাডর্ট একই সঙ্গে ইসরাইলের মন্ত্রিসভা থেকেও বেন-গভিরকে বাদ দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। তার মতে, সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর ইউরোপের পক্ষ থেকে কঠোর অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন।
বেন-গভিরের সর্বশেষ মন্তব্যকে কেন্দ্র করে জার্মানিতে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তাতে তার বিরুদ্ধে ইউরোপীয় পর্যায়ে নিষেধাজ্ঞার দাবি নতুন করে জোরালো হয়েছে। একই সঙ্গে গাজায় বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের প্রশ্নে ইসরাইলের ভূমিকা নিয়েও ইউরোপে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
সূত্রঃ ডয়চে ভেলে
এম.কে

