15 C
London
September 24, 2026
TV3 BANGLA
বাংলাদেশ

বঙ্গোপসাগর ঘিরে বাড়ছে বাংলাদেশের গুরুত্বঃ বড় শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ

দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে ভৌগোলিক অবস্থান এবং বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় অবস্থানের কারণে বাংলাদেশকে ঘিরে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় শক্তিগুলোর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত আগ্রহ রয়েছে। বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সংযোগ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশের একদিকে ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ স্থলসীমান্ত, অন্যদিকে মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। এই ভৌগোলিক অবস্থান দেশটিকে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে যোগাযোগের সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরেছে। বঙ্গোপসাগর আবার ভারত মহাসাগরের উত্তর-পূর্ব অংশে অবস্থিত হওয়ায় দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সামুদ্রিক যোগাযোগেও এর গুরুত্ব রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের দেশভিত্তিক তথ্যেও বাংলাদেশকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে কৌশলগতভাবে অবস্থিত দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভারত, চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও সেখানে তুলে ধরা হয়েছে।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও বাণিজ্য। বাংলাদেশ ২০১৬ সালে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে যুক্ত হয়। ২০২৬ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও অন্যান্য খাতে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও চীনের আগ্রহের কথা উঠে এসেছে।

চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য বাণিজ্যঘাটতি কমানো এবং বাংলাদেশি পণ্যের জন্য চীনের বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পাশাপাশি অবকাঠামো ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চীনের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত।

অন্যদিকে ভারতের জন্য বাংলাদেশের গুরুত্বের একটি বড় দিক হলো উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও ভারতের মূল ভূখণ্ডের মধ্যে আঞ্চলিক যোগাযোগ। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও যোগাযোগ নিয়ে দীর্ঘদিনের সহযোগিতা রয়েছে। ২০২৬ সালেও সীমান্তে সমন্বিত টহল ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বাড়ানোর বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার কথা উঠে এসেছে।

বাংলাদেশের স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক যোগাযোগ অবকাঠামো ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ফলে ঢাকার নীতিগত সিদ্ধান্ত ভারতের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত স্বার্থের সঙ্গেও সম্পর্কিত হয়ে উঠতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে। দুই দেশের মধ্যে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সীমান্ত নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম এবং দুর্যোগ মোকাবিলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা রয়েছে। বাংলাদেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার কথা দেশটির সরকারি তথ্যসূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৬ সালে বাংলাদেশে চীনের প্রভাবের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিকল্প প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার প্রস্তাব দেওয়ার বিষয়টি রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এতে বাংলাদেশের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত—দুই ধরনের স্বার্থের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

বাংলাদেশের বন্দর ও যোগাযোগ অবকাঠামো নিয়েও আঞ্চলিক পর্যায়ে আগ্রহ রয়েছে। চীনের বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশ সমুদ্রপথে পরিবাহিত হয় এবং মালাক্কা প্রণালী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। ফলে বিকল্প ও নিরাপদ সরবরাহপথের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক আলোচনার অংশ।

বড় শক্তিগুলোর পারস্পরিক প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য কিছু অর্থনৈতিক সুযোগও তৈরি করতে পারে। অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদেশি বিনিয়োগ, বন্দর সক্ষমতা বৃদ্ধি, আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং নতুন বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক অংশীদারত্ব বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক শুধু চীনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গেও বাংলাদেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের সরকারি পররাষ্ট্রনীতিতেও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং পারস্পরিক সম্মানের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়।

বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা যেমন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, তেমনি বাংলাদেশের জন্য নীতিগত ভারসাম্য বজায় রাখার প্রয়োজনও বাড়ায়। বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে ঋণের শর্ত, আর্থিক কার্যকারিতা, পরিবেশগত প্রভাব, স্থানীয় কর্মসংস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা কাঠামোর মতো বিষয়গুলোও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সংলাপও সাম্প্রতিক সময়ে আরও সক্রিয় হয়েছে। ২০২৬ সালের আগস্টে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানানো হয়।

সব মিলিয়ে, বঙ্গোপসাগর, স্থলসীমান্ত এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব বাস্তব। চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের যেমন নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে, তেমনি বাংলাদেশেরও রয়েছে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ ও অগ্রাধিকার।

বাংলাদেশের সামনে তাই মূল বিষয় হয়ে উঠছে বহুমুখী অংশীদারত্ব বজায় রেখে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও নিরাপত্তার সুযোগ কাজে লাগানো এবং একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা।

সূত্রঃ রয়টার্স \ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর \ যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টিগ্রেটেড কান্ট্রি স্ট্র্যাটেজি

এমকে

আরো পড়ুন

‘চট্টগ্রাম বলয়’ ও গোয়েন্দা নির্ভরতায় পতন—প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির নেপথ্য

দেশ ছাড়তে পারলেন না সাদেকা হালিম, সঙ্গে ছিল ব্রিটিশ পাসপোর্ট

টেলিযোগাযোগ অধ্যাদেশের চূড়ান্ত খসড়া অনুমোদনঃ বিচারকের আদেশ ছাড়া ফোনে আড়ি পাতা নয়