11.8 C
London
October 16, 2026
TV3 BANGLA
বাংলাদেশ

বঙ্গোপসাগরে জেগে উঠছে আরেক বাংলাদেশঃ ৫০ বছরে উপকূলে বেড়েছে ৫৯০ বর্গকিলোমিটার

নদীবাহিত পলি জমে বঙ্গোপসাগরে নতুন নতুন চর ও দ্বীপ গঠিত হচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের কোথাও ভূমি বাড়ছে, আবার কোথাও নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে পুরোনো ভূমি বিলীন হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত উত্তর বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় এলাকায় নিট ভূমির পরিমাণ প্রায় ৫৯০ বর্গকিলোমিটার বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা, পরিকল্পিত বালু ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে বঙ্গোপসাগরে নতুন ভূমি গঠনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যেতে পারে।

বাংলাদেশের গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীব্যবস্থা প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ পলি বঙ্গোপসাগরে নিয়ে আসে। দৈনিক সংগ্রামের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নদীগুলো প্রতিবছর আনুমানিক ১৮০ থেকে ২৫০ কোটি টন পলি বহন করে। এসব পলি নদীর মোহনা ও উপকূলীয় এলাকায় জমে নতুন চর গঠনে ভূমিকা রাখে। তবে পলি জমার পাশাপাশি ঢেউ, জোয়ার-ভাটা, সমুদ্রস্রোত ও নদীভাঙনের কারণে উপকূলের আকৃতিও নিয়মিত পরিবর্তিত হয়।

২০১০ সালে প্রকাশিত ‘উড়িরচরে ভূমিক্ষয় ও নতুন ভূমি গঠনের চিত্র: বাংলাদেশের উপকূলের পরিবর্তন’ শীর্ষক গবেষণায় দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ১৮৫টি চর শনাক্ত করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৭২টি সামুদ্রিক ও মোহনার দ্বীপ, ৯২টি মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত নদীচর এবং ২১টি মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন নদীচর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এ ছাড়া জেলেদের অভিজ্ঞতায় আরও কিছু ডুবো চর ও অগভীর এলাকার তথ্য পাওয়া যায়, যেগুলোর সবগুলো সরকারি নথিতে অন্তর্ভুক্ত কি না, তা নিশ্চিত নয়।

ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের গবেষক মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান, মো. নাজমুল আজিম বেগ ও জহিরুল হক খানের গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৯৯ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত শুধু মেঘনা মোহনাতেই নিট পলি সঞ্চয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ হাজার ৭৬০ মিলিয়ন ঘনমিটার। এ সময়ে সেখানে বছরে গড়ে প্রায় ২৭৬ মিলিয়ন ঘনমিটার পলি জমেছিল। নদী থেকে আসা এই পলি উপকূলীয় ভূমির পরিবর্তন ও নতুন চর গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

উপকূলের ভূমি বৃদ্ধির আরেকটি চিত্র উঠে এসেছে ১৯৭৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ফেনী মোহনার দ্বীপগুলোর ওপর পরিচালিত গবেষণায়। বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. বখতিয়ার রশীদ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আবদুর রহমানের যৌথ গবেষণায় দেখা যায়, ওই এলাকার দ্বীপগুলোর সম্মিলিত আয়তন ১৯৭৮ সালে প্রায় ৩৭৭ বর্গকিলোমিটার ছিল। ২০২০ সালে তা বেড়ে প্রায় ১ হাজার ৬৩ বর্গকিলোমিটারে পৌঁছায়। গবেষণা অনুযায়ী, এ সময়ে আয়তন বৃদ্ধির গড় হার ছিল বছরে প্রায় ১৪ দশমিক ৬৪ বর্গকিলোমিটার। তবে এ অঞ্চলেও ভূমি বৃদ্ধির পাশাপাশি কিছু এলাকায় ভাঙন ঘটেছে।

ভাসানচর, উড়িরচর, চর নিজাম ও জাহাজের চরের মতো এলাকায় ভূপ্রকৃতির পরিবর্তন এবং নতুন ভূমি গঠনের নজির রয়েছে। এসব উদাহরণ দেখায়, বঙ্গোপসাগরের উপকূল স্থির নয়; পলি সঞ্চয় ও ক্ষয়ের পারস্পরিক প্রভাবে এর আকৃতি বদলে যাচ্ছে। ফলে নতুন ভূমি তৈরির সম্ভাবনা যাচাই করতে হলে শুধু জমির আয়তন বৃদ্ধি নয়, একই সঙ্গে ভূমির স্থায়িত্ব ও আশপাশের উপকূলের পরিবর্তনও বিবেচনায় নিতে হবে।

বাংলাদেশে উন্নয়ন, আবাসন ও অবকাঠামো নির্মাণে বালুর চাহিদা অনেক। তবে নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করলে নদীর তলদেশের গঠন, পানিপ্রবাহ ও তীরের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের অংশগ্রহণে সোমেশ্বরী নদী নিয়ে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নদীটি থেকে বছরে প্রায় ২৯৬ মিলিয়ন ঘনফুট বা প্রায় ৮৩ লাখ ৮০ হাজার ঘনমিটার বালু বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলিত হয়। এর আনুমানিক অর্থনৈতিক মূল্য প্রায় ১৮ দশমিক ৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

ওই গবেষণায় ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সোমেশ্বরী নদীর প্রায় ৩১ হেক্টর নিট ভূমিক্ষয়ের তথ্যও উঠে এসেছে। গবেষকেরা উপগ্রহচিত্র, সরেজমিন পর্যবেক্ষণ, বালুর নমুনা পরীক্ষা, স্থানীয় পরিবারের ওপর জরিপ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করেন। গবেষণাটি নদী থেকে বালু উত্তোলনের অর্থনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি পরিবেশ ও স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও তুলে ধরে।

আইএএইচআর প্রতিবেদনে বালু ব্যবস্থাপনার সম্ভাবনা বোঝাতে একটি গাণিতিক হিসাব দেওয়া হয়েছে। সোমেশ্বরী নদী থেকে বছরে ২৯৬ মিলিয়ন ঘনফুট বালু উত্তোলনের হার টানা ৫০ বছর অপরিবর্তিত থাকলে মোট পরিমাণ দাঁড়াত প্রায় ১৪ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট বা ৪১ কোটি ৯০ লাখ ঘনমিটার।

একইভাবে, নির্দিষ্ট পরিমাণ বালু দিয়ে কতটুকু জমি ভরাট করা সম্ভব, তা নির্ভর করে সমুদ্রের গভীরতা, কাঙ্ক্ষিত ভূমির উচ্চতা, ঢেউ, স্রোত, জোয়ার-ভাটা, বালুর প্রকৃতি এবং ভূমি স্থিতিশীল রাখার ব্যবস্থার ওপর। তাই নদী থেকে উত্তোলিত বালু সরাসরি সমুদ্রে ফেলে স্থায়ী ভূমি তৈরি করা যাবে—এমন সিদ্ধান্ত শুধু আয়তনভিত্তিক গাণিতিক হিসাব দিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এবং মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ড. মোহাম্মদ আব্দুর রব বলেন, বঙ্গোপসাগরে নতুন ভূমি গঠনের সম্ভাবনা যাচাইয়ের সময় শুধু কোনো চরের আয়তন বাড়ছে কি না, তা দেখলে চলবে না। কোথায় পলি জমছে, কোথায় ভাঙন হচ্ছে এবং স্রোত ও জোয়ার-ভাটার কারণে ভূমির আকৃতি কীভাবে বদলাচ্ছে, সেসব বিষয়ও বিশ্লেষণ করতে হবে।

তার মতে, উপগ্রহচিত্র, দীর্ঘমেয়াদি উপকূলরেখার মানচিত্র এবং নদী ও সমুদ্রের গতিপ্রকৃতির তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে ভূমি পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা করতে হবে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে চরগুলোর মধ্যে কৃত্রিম বাঁধ নির্মাণ বা পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ভূমি বৃদ্ধির সুযোগ থাকতে পারে। তবে এ ধরনের উদ্যোগের আগে সম্ভাব্য পরিবেশগত ও ভৌগোলিক প্রভাব বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির বলেন, নতুন চর বা দ্বীপ গঠনের পর সেগুলোর সঠিক ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পরিকল্পিত বসতি নিশ্চিত করা জরুরি। অপরিকল্পিত বসতি, পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনের অভাব এবং প্রাকৃতিক জলপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি হলে দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের ক্ষতি ও মানুষের জীবন-জীবিকার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তার মতে, নদীর বালু যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা করা গেলে সমুদ্রে ভূমি বৃদ্ধির সম্ভাবনা কাজে লাগানো যেতে পারে।

নদী ও পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক শরীফ জামিল বলেন, নদী থেকে বালু উত্তোলনের আগে বিজ্ঞানসম্মত সমীক্ষা করা জরুরি। কোন এলাকা থেকে কতটুকু বালু তোলা হবে, তাতে নদীর তলদেশ ও তীরের কী পরিবর্তন হতে পারে এবং নদীভাঙনের ঝুঁকি বাড়বে কি না, তা যাচাই করতে হবে। তার মতে, একদিকে নতুন ভূমি তৈরির সম্ভাবনা থাকলেও অন্যদিকে নদীর তীর, বসতি, কৃষিজমি ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হলে প্রকল্পের সামগ্রিক সুফল প্রশ্নের মুখে পড়বে।

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদারও নদী থেকে বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে সতর্কতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। সোমেশ্বরী নদীর বালু উত্তোলনের পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাববিষয়ক গবেষণার সহলেখক হিসেবে তিনি নদীর গতিপথের পরিবর্তন, গভীর খননের ফলে সৃষ্ট গর্ত এবং স্থানীয় পরিবেশ ও মানুষের জীবিকার ঝুঁকি পর্যালোচনা করেছেন। তার মতে, বঙ্গোপসাগরে ভূমি বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হলে নদী থেকে বালু উত্তোলনের প্রভাব বিবেচনা করে পরিকল্পিতভাবে কাজ করতে হবে। নতুন চরে উপযোগী উপকূলীয় উদ্ভিদ, যেমন কেউড়া গাছ লাগানোও ভূমি সংরক্ষণের উদ্যোগের অংশ হতে পারে।

বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিজমির ওপর চাপ এবং আবাসন ও অবকাঠামোর চাহিদার কারণে উপকূলীয় ভূমি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে বঙ্গোপসাগরে নতুন ভূমি তৈরির সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে নদী ও সমুদ্রের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, পরিকল্পিত বালু ব্যবস্থাপনা এবং উপকূলীয় মানুষের স্বার্থ সুরক্ষার সমন্বয় প্রয়োজন।

সূত্রঃ আই এ এইচ আর

এমকে

আরো পড়ুন

পানিবণ্টনে ভারত আপসে রাজি না হলে আন্তর্জাতিক আইনের আশ্রয় নেবে বাংলাদেশ

সাগর-রুনি হত্যার তদন্তে বিলম্ব বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে উপহাসঃ হাইকোর্ট

লাইসেন্স পেল রূপপুর, যেতে পারবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে