বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কর্মরত হেলাল মিয়াকে ঘিরে রাজনৈতিক পরিচয়, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার এবং বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শ্রমিক লীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকা এই ব্যক্তি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিএনপির ঘনিষ্ঠ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
শ্রমিক লীগের কমিটিতে সাংগঠনিক সম্পাদকঃ
প্রাপ্ত একটি কমিটির তালিকা অনুযায়ী, হেলাল মিয়া বিমান শ্রমিক লীগ (সিবিএ)-এর ‘সিলেট বিভাগীয় শপ কমিটি’র সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তালিকায় তার পদবি ‘অর্গানাইজিং সেক্রেটারি’, পেশাগত পরিচয় ‘অ্যাডমিন সুপারভাইজার’ এবং পরিচিতি নম্বর জি-৫০২৩৯ উল্লেখ রয়েছে। তালিকায় তার নামের পাশে ক্রমিক নম্বর ৫ দেওয়া হয়েছে। নথি অনুযায়ী, কমিটিটি ২০২৩-২০২৫ মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হয়েছিল।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শ্রমিক লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সুবাদে তিনি সিলেট অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করতেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তার রাজনৈতিক পরিচয় ও যোগাযোগ নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে তাদের দাবি।

বিএনপির পরিচয় ব্যবহার করে অবস্থান শক্ত করার অভিযোগঃ
অভিযোগকারীদের একাংশের দাবি, অতীতে আওয়ামী লীগ ও শ্রমিক লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে পরিচিত হেলাল মিয়া বর্তমানে বিএনপির ঘনিষ্ঠ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন। এ উদ্দেশ্যে সিলেট বিমানবন্দরসংলগ্ন এলাকায় বিএনপির ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
তাদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তন ও দলীয় কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ততা দেখিয়ে তিনি কর্মস্থলে নিজের অবস্থান শক্ত রাখার চেষ্টা করছেন।
প্রায় ১৬ বছর একই কর্মস্থলে থাকার অভিযোগঃ
অভিযোগ রয়েছে, হেলাল মিয়া প্রায় ১৬ বছর ধরে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালন করছেন। তার বাড়ি সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলায় বলে জানা গেছে। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বদলি নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না।
বদলি ঠেকাতে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কিছু কর্মকর্তার পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ার অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এমনকি বদলি ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে নিয়মিত অর্থ পাঠানোর জনশ্রুতি রয়েছে বলেও অভিযোগকারীদের দাবি।
কর্মচারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও হয়রানির অভিযোগঃ
হেলাল মিয়ার বিরুদ্ধে বিমানবন্দরে কর্মরত কর্মচারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, মারধর এবং মানসিকভাবে হয়রানি করার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিশেষ করে সিলেটের বাইরের জেলার কর্মচারীদের সঙ্গে তিনি বৈষম্যমূলক আচরণ করেন। সিলেটে কর্মরত কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের সঙ্গেও তার খারাপ আচরণের অভিযোগ রয়েছে।


এ ছাড়া মজুমদারী অফিসে কর্মরত অবস্থায় নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের পদায়নে প্রভাব বিস্তার, ঘুষ গ্রহণ এবং অর্থনৈতিক লেনদেনের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। তাদের দাবি, প্রাপ্য ছুটি, ওভারটাইমের অর্থ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেতন পেতেও কর্মচারীদের সমস্যার মুখে পড়তে হয়।
আব্দুর রবের বদলি ও প্রশাসনিক প্রভাবের প্রশ্নঃ
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিমানের সহকারী ম্যানেজার (অ্যাডমিন) আব্দুর রবকে ঢাকা বদলি করার পেছনে হেলাল মিয়ার ভূমিকা ছিল। তাদের দাবি, হেলাল মিয়ার কথিত অনিয়মের কাজে বাধা দেওয়ায় আব্দুর রবকে বদলি করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল।
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, আব্দুর রবকে বদলি করার পর হারুনুর রশীদকে সিলেটে নিয়ে আসার ক্ষেত্রেও হেলাল মিয়ার প্রভাব ছিল। হারুনুর রশীদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েও অভিযোগকারীদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
৫ আগস্টের পর নেতা-কর্মীদের লন্ডনযাত্রায় সহায়তার অভিযোগঃ
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা-কর্মীকে সিলেট বিমানবন্দর দিয়ে লন্ডনে যেতে সহায়তা করার অভিযোগও উঠেছে হেলাল মিয়ার বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যাতায়াত এবং তাদের কোনো ধরনের সহায়তা দেওয়া হয়েছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
তদন্ত ও জবাবদিহির দাবিঃ
অভিযোগকারীদের বক্তব্য, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব ও পদায়নের ক্ষেত্রে পরিবর্তন এলেও হেলাল মিয়া দীর্ঘদিন ধরে সিলেট বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালন করছেন। তার রাজনৈতিক পরিচয়, একই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন থাকার কারণ, বদলি ও পদায়নে কথিত প্রভাব এবং প্রকল্পসংক্রান্ত অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
তাদের মতে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা এবং অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া।
বক্তব্য পাওয়া যায়নিঃ
হেলাল মিয়ার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে চেয়ে তার ব্যক্তিগত ফোন নাম্বারে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন বলে জানা যায়।
এমকে

