মুসলিম ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করতে যুক্তরাজ্যের অস্বীকৃতিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনার জন্য নিজ দেশের নাগরিকদের রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন সীমিত করেছে।
ফাইন্যানশিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আবুধাবি রাষ্ট্রীয় বৃত্তির জন্য অনুমোদিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তালিকা থেকে যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বাদ দিয়েছে। একই তালিকায় ইসরায়েল, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়কে অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছে, যা ইউএই-এর নীতিগত অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করেছে।
এই সিদ্ধান্তের প্রভাব ইতোমধ্যেই শিক্ষার্থীদের সংখ্যায় পড়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে যুক্তরাজ্যে পড়াশোনার জন্য ইউএই থেকে ২১৩ জন শিক্ষার্থী ভিসা পেয়েছেন, যা ২০২২ সালের একই সময়ের তুলনায় ৫৫ শতাংশ কম। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল শিক্ষানীতির পরিবর্তন নয়, বরং কূটনৈতিক সম্পর্কে গুরুতর অবনতির ইঙ্গিত।
ফাইন্যানশিয়াল টাইমস উদ্ধৃত সূত্রগুলোর দাবি, আমিরাতি কর্তৃপক্ষের উদ্বেগ—ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তাদের সন্তানরা ‘চরমপন্থী মতাদর্শে প্রভাবিত’ হতে পারে। এই অবস্থানের জবাবে ব্রিটিশ কর্মকর্তারা একাডেমিক স্বাধীনতা ও মুক্ত চিন্তার পরিবেশ রক্ষার গুরুত্বের কথা তুলে ধরেছেন।
এই বিরোধের মূল কেন্দ্রে রয়েছে মুসলিম ব্রাদারহুড ইস্যু। ইউএই দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাজ্যকে সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানিয়ে আসছে। গত ডিসেম্বরে আবুধাবি এক ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ হিসেবে ডানপন্থী রিফর্ম ইউকে পার্টির নেতা নাইজেল ফারাজের আবুধাবি সফরের ব্যয় বহন করে, যেখানে তিনি শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মুসলিম ব্রাদারহুডবিরোধী অবস্থান নিয়ে আলোচনা করেন।
জাতীয় জনমত জরিপে এগিয়ে থাকা রিফর্ম ইউকে ক্ষমতায় গেলে মুসলিম ব্রাদারহুড নিষিদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের লেবার সরকার জানিয়েছে, সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি তারা ‘ঘনিষ্ঠভাবে পর্যালোচনা’ করছে, তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।
মুসলিম ব্রাদারহুড প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২৮ সালে মিসরের কায়রোতে এবং এটি বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ইসলামপন্থী সংগঠন হিসেবে পরিচিত। সংগঠনটি নিজেকে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী বলে দাবি করলেও মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার একাধিক দেশ—মিসর, সৌদি আরব, বাহরাইন ও ইউএই—এটিকে নিষিদ্ধ করেছে।
২০১৭ সালে যুক্তরাজ্যের সংসদের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটি এক প্রতিবেদনে রাজনৈতিক ইসলামপন্থীদের সহিংস চরমপন্থার বিরুদ্ধে ‘ফায়ারওয়াল’ হিসেবে উল্লেখ করে তাদের সঙ্গে সংলাপের পক্ষে মত দিয়েছিল। তবে সেই তদন্তের পেছনেও ইউএই-এর লবিং ভূমিকা রেখেছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
যুক্তরাজ্যে অহিংস রাজনৈতিক ইসলামের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার জন্য ইউএই-এর চাপ নতুন নয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দেশটি আটটি ব্রিটিশ সংগঠনকে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত করে, যদিও এসব সংগঠনের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ আইনে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষাখাতে এই অর্থায়ন কড়াকড়ি শুধু শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নয়, বরং যুক্তরাজ্য–ইউএই সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি দিকনির্দেশও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। একদিকে একাডেমিক স্বাধীনতা, অন্যদিকে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক আনুগত্য—এই দ্বন্দ্ব এখন কূটনৈতিক সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে।
সূত্রঃ মিডল ইস্ট আই
এম.কে

