15.7 C
London
October 11, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ব্রিটেনে ভাতানির্ভরতার ভয়াবহ চিত্রঃ ৬৭ লাখ মানুষ পান কর্মহীনতাসংক্রান্ত সরকারি সহায়তা

ব্রিটেনের ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের হাজারো এলাকায় কর্মক্ষম বয়সী মানুষের অর্ধেকেরও বেশি কর্মহীন অবস্থায় সরকারি ভাতা গ্রহণ করছেন। সেন্টার ফর সোশ্যাল জাস্টিসের (সিএসজে) এক বিশ্লেষণে এমন চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, এসব এলাকায় কর্মক্ষম বয়সী মানুষের মধ্যে কর্মহীনদের জন্য নির্ধারিত ভাতা গ্রহণকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশটির কল্যাণব্যবস্থায় সংস্কারের দাবি উঠেছে।

সিএসজে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে এমন ৩ হাজার ৩৬৯টি এলাকা শনাক্ত করেছে, যেখানে কর্মক্ষম বয়সী মানুষের অর্ধেকের বেশি কর্মহীন ভাতা পান। প্রতিটি এলাকায় গড়ে প্রায় ২৫০ জন বাস করেন। সব মিলিয়ে এসব এলাকায় প্রায় ৮ লাখ ৬০ হাজার মানুষের বসবাস, যা লিডস শহরের জনসংখ্যার কাছাকাছি। কোনো কোনো সড়কে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পরিবারের সদস্যরা কর্মহীনদের জন্য নির্ধারিত ভাতা গ্রহণ করেন।

ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের আরও প্রায় ১৯ হাজার এলাকায় কর্মক্ষম বয়সী মানুষের এক-তৃতীয়াংশের বেশি কর্মহীন ভাতা পান। এসব এলাকায় মোট প্রায় ৬০ লাখ মানুষের বসবাস।

সিএসজের প্রতিষ্ঠাতা এবং ইউনিভার্সাল ক্রেডিট ব্যবস্থার অন্যতম পরিকল্পনাকারী স্যার ইয়ান ডানকান স্মিথ বলেছেন, ব্রিটেনে বিপুলসংখ্যক মানুষ দীর্ঘমেয়াদি ভাতানির্ভরতার মধ্যে পড়ে গেছেন। তার মতে, স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে দেওয়া কিছু ভাতা মানুষের কাজে ফেরার আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে। তবে প্রতিবেদনে উঠে আসা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলোতে শারীরিক অসুস্থতা, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ও চাকরি না পাওয়ার মতো বিভিন্ন কারণও উঠে এসেছে।

শহরভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি এমন এলাকা রয়েছে বার্মিংহামে—১৬৬টি। এরপর লিভারপুলে ১১২টি, শেফিল্ডে ৮২টি এবং ব্র্যাডফোর্ডে ৮১টি এলাকা রয়েছে।

ব্ল্যাকপুলে এ ধরনের এলাকার অনুপাত সবচেয়ে বেশি। শহরটির মোট এলাকার ১৫ শতাংশকে ‘ভাতানির্ভরতার হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। হার্টলপুলে এই হার ১২ শতাংশ এবং রেডকার অ্যান্ড ক্লিভল্যান্ডে ৮ শতাংশ। অন্যদিকে, লিভারপুলের প্রায় ২২ শতাংশ এবং বার্মিংহামের ১৮ শতাংশ এলাকায় কর্মক্ষম বয়সী মানুষের অন্তত ৪০ শতাংশ কর্মহীন ভাতা গ্রহণ করেন। লন্ডনে এমন এলাকার হার মাত্র ২ শতাংশ।

ইংল্যান্ড, ওয়েলস ও স্কটল্যান্ড মিলিয়ে প্রায় ৬৭ লাখ মানুষ অন্তত একটি কর্মহীনতাসংক্রান্ত সরকারি ভাতা পান। ২০১৯ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩৯ লাখ। বর্তমানে কর্মক্ষম বয়সী প্রতি ছয়জনের প্রায় একজন, অর্থাৎ ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ, এই ধরনের ভাতা গ্রহণ করছেন।

কর্মহীনতার পাশাপাশি স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে ভাতা গ্রহণকারীর সংখ্যাও বেড়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, অক্ষমতাজনিত ভাতা গ্রহণকারীর সংখ্যা ৬১ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে কর্মক্ষম বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিবন্ধিতার হার বেড়েছে ১৬ শতাংশ। ২০১৯ সালের পর থেকে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ এমন ভাতা গ্রহণ করছেন, যাদের চাকরি খোঁজা বা কর্মসংস্থানের প্রস্তুতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই।

সিএসজের ২৫০ পৃষ্ঠার ‘স্টেট অব ডিপেনডেন্সি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাস মহামারির পর স্বাস্থ্যগত কারণে কর্মবিমুখতার বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ব্রিটেনের কল্যাণ খাতে ব্যয় বেড়ে ১৩ হাজার ৬১০ কোটি পাউন্ডে পৌঁছানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মহামারির পর থেকে এ ব্যয় প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

বার্মিংহামের স্পার্কব্রুক এলাকার বাসিন্দা ৪৭ বছর বয়সী কারোল ক্রাভচিক জানান, পাঁচ বছর আগে আঘাত পাওয়ার পর থেকে তিনি আর নিয়মিত কাজ পাচ্ছেন না। আগে নির্মাণক্ষেত্রে ওয়েল্ডার ও ফর্কলিফট পরিচালনাকারী হিসেবে কাজ করতেন তিনি। হাঁটাচলায় সমস্যা হওয়ায় কাজে ফিরতে পারছেন না বলে জানান। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ভাতা বা পিআইপির জন্য দুবার আবেদন করেও প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।

একই এলাকার ২৫ বছর বয়সী ক্যামেরন লুকাস জানান, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে কাজে টিকে থাকতে পারেননি। প্রায় ১০০টি চাকরির জন্য আবেদন করেও সাড়া না পাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমানে ইউনিভার্সাল ক্রেডিটের ওপর নির্ভর করছেন।

ব্রিটেনের কর্মসংস্থান ও পেনশনবিষয়ক দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে অনেক এলাকায় কর্মহীনতা স্থায়ী সমস্যায় পরিণত হয়েছে এবং অসুস্থতাকে পিছিয়ে পড়ার কারণ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সরকার ইউনিভার্সাল ক্রেডিটের সাধারণ ভাতা ও স্বাস্থ্যগত কারণে দেওয়া ভাতার মধ্যকার ব্যবধান কমানো, সরাসরি উপস্থিত হয়ে স্বাস্থ্য মূল্যায়ন পুনরায় চালু করা এবং কর্মসংস্থানে সহায়তার জন্য ৩৫০ কোটি পাউন্ড বিনিয়োগসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে।

সরকারের দাবি, এসব সংস্কারের লক্ষ্য হলো মানুষকে কর্মসংস্থানে ফিরিয়ে আনা এবং দীর্ঘমেয়াদে কল্যাণব্যবস্থাকে টেকসই করা। অন্যদিকে, সিএসজের প্রতিবেদনে কর্মহীনতা ও স্বাস্থ্যগত কারণে ভাতানির্ভরতা কমাতে আরও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ

এমকে

আরো পড়ুন

ব্যাংকিং জটিলতায় ফি পরিশোধে দেরিঃ ভিসা বাতিলের মুখে যুক্তরাজ্যে বিদেশি শিক্ষার্থী

বিবি স্টকহোমে আশ্রয়প্রার্থীদের সঙ্গে ‘গবাদি পশুর’ মতো আচরণ

‘ওয়ান ইন, ওয়ান আউট’ নীতিতে বিতর্কঃ অসুস্থ ও নির্যাতিতদেরও ফেরত পাঠাচ্ছে যুক্তরাজ্য