ব্রিটেনের গ্রেটার ম্যানচেস্টারের স্টকপোর্টে ইসলামবিদ্বেষী হামলার ঘটনায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে। গত ১৮ মাসে এলাকার একটি মসজিদে ছয়বার হামলার ঘটনা ঘটেছে। মসজিদের জানালা ভাঙচুর, ছাদে শূকরের মাংসজাত পণ্য নিক্ষেপ এবং পবিত্র কোরআনের কপি ক্ষতিগ্রস্ত করার মতো ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতির কারণে সন্তানদের স্থানীয় মসজিদে নিয়ে যেতে ভয় পাচ্ছেন অনেক অভিভাবক।
ম্যানচেস্টার ইভনিং নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্টকপোর্টের এজলিতে অবস্থিত এলাফ মসজিদ বারবার ইসলামবিদ্বেষী হামলার শিকার হয়েছে। স্থানীয় এক কাউন্সিলর জানিয়েছেন, মাত্র সাত বছর বয়সী শিশুরাও বর্ণবাদী গালিগালাজের শিকার হয়েছে। স্টকপোর্টের মসজিদগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী এক কমিউনিটি নেতার দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের বিভিন্ন এলাকার মধ্যে স্টকপোর্টেই মুসলিম উপাসনালয়গুলোতে সবচেয়ে বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে।
গত জানুয়ারিতে চিডল এলাকায় এক মুসলিম পরিবারের বাড়ির গেটেও শূকরের মাথা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। স্কুলে যাওয়ার সময় পরিবারের সদস্যরা বাড়ির প্রবেশপথে শূকরের মাথাটি দেখতে পান। নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে দুজনকে বাড়ির সামনে এসে শূকরের মাথাটি গেটের ওপর বসিয়ে দিতে দেখা যায়। পুলিশ তদন্ত করলেও অভিযুক্তদের শনাক্ত করতে পারেনি।
ঘটনার প্রায় ১০ মাস পরও পরিবারটি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে বলে জানিয়েছেন বাড়ির মালিক কামরান বাট। তার ভাষায়, ১৯৯০-এর দশক থেকে তিনি চিডলে বসবাস করছেন। কিন্তু গত চার-পাঁচ বছরে এলাকার পরিবেশে পরিবর্তন এসেছে। মানুষ এখন অনলাইনে ও প্রকাশ্যে এমন মন্তব্য করতে সাহস পাচ্ছে, যা আগে দেখা যেত না। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় পরিবারের সদস্যদের বেশি সতর্ক থাকতে হচ্ছে।
এলাফ মসজিদে গত মার্চে রমজান শেষে ঈদ উদযাপনের কয়েক ঘণ্টা পর ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এরপর মসজিদ কর্তৃপক্ষ স্থানীয় সংসদ সদস্য নাভেন্দু মিশ্রের সহযোগিতায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপাসনালয়ের নিরাপত্তা তহবিলের জন্য আবেদন করে। বর্তমানে সেখানে ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তা, উন্নত মানের সিসিটিভি এবং শক্তিশালী দরজা-জানালা স্থাপন করা হয়েছে। এসব ব্যবস্থা নেওয়ার পর মার্চ থেকে নতুন কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি।
তবে নিরাপত্তা জোরদার করেও মুসলিম পরিবারগুলোর আতঙ্ক কাটেনি। মসজিদ পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত আহমেদ হেলাল জানিয়েছেন, এক বাবা সন্তানদের নিরাপত্তার কথা ভেবে মসজিদে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন। তার আশঙ্কা, কখন আবার হামলা হবে তা কেউ জানে না। বিশেষ করে নারীরা বেশি ভীতির মধ্যে রয়েছেন।
আহমেদ হেলাল বলেন, নিরাপত্তারক্ষীর পাহারায় নামাজ আদায় করা কোনো স্বাভাবিক পরিস্থিতি হতে পারে না। মানুষ কোনো অপরাধ না করেও কেন উপাসনালয়ে নিরাপত্তার মধ্যে ইবাদত করবে, সেটি অত্যন্ত দুঃখজনক।
স্টকপোর্ট কাউন্সিল অব মস্কসের ডা. জাওয়াদ আমিন জানিয়েছেন, গত ১৮ মাসে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের অন্য যেকোনো বরোর তুলনায় স্টকপোর্টে মসজিদে হামলার ঘটনা বেশি ঘটেছে। যদিও ঘটনাগুলো আলাদা আলাদা, তারপরও এর ধারাবাহিকতা উদ্বেগজনক। তার মতে, মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ কেন বাড়ছে এবং এসব হামলার পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা নিয়ে আরও আলোচনা প্রয়োজন।
গ্রেটার ম্যানচেস্টার পুলিশের প্রধান স্যার স্টিফেন ওয়াটসন বলেছেন, ইহুদি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ইহুদিবিদ্বেষ যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি ইসলামবিদ্বেষ কিংবা অন্য কোনো ধরনের বিদ্বেষমূলক অপরাধও সহ্য করা হবে না। কোনো অভিভাবক সন্তানকে উপাসনালয় কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাতে ভয় পাবেন, এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
তিনি আরও বলেন, জাতিগত পরিচয় কিংবা ধর্মের কারণে কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করার চেষ্টা হলে পুলিশ কঠোরভাবে ব্যবস্থা নেবে।
স্টকপোর্টের একমাত্র মুসলিম কাউন্সিলর হুমা খান সম্প্রতি কাউন্সিলের বৈঠকে বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, তার নিজের সাত বছর বয়সী ভাগ্নেসহ পরিবারের ছোট সদস্যরাও বর্ণবাদী আচরণের শিকার হয়েছে। মুসলিমদের বাড়িঘর ও উপাসনালয়কে লক্ষ্য করে এসব হামলা মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি করছে।
স্টকপোর্টের সংসদ সদস্য নাভেন্দু মিশ্রও হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্বেষ ও বিভাজন বাড়ছে। তবে যারা এ ধরনের ঘৃণ্য কাজ করছে, তারা স্টকপোর্টের প্রকৃত মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে না।
এদিকে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র বেভ ক্রেগ জানিয়েছেন, হামলার ঝুঁকিতে থাকা মসজিদগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করা হবে। পাশাপাশি স্কুলগুলোতেও বিদ্বেষ ও বৈষম্যবিরোধী সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রতিবেদনে দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্রেটার ম্যানচেস্টারে মুসলিমদের লক্ষ্য করে ৩৪৩টি বিদ্বেষমূলক অপরাধের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ। একই সময়ে জাতিগত বিদ্বেষপ্রসূত অপরাধের সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৪৩৮টি।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের মার্চে শেষ হওয়া বছরে পুরো যুক্তরাজ্যে মুসলিমদের লক্ষ্য করে ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক অপরাধ ১৫ শতাংশ বেড়েছে। তবে সামাজিকভাবে নানা কারণে অনেক ঘটনা পুলিশের কাছে রিপোর্ট করা হয় না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্টকপোর্ট কাউন্সিল জানিয়েছে, বিদ্বেষমূলক অপরাধের অভিযোগ জানানোর সুযোগ বাড়াতে নতুন রিপোর্টিং সেন্টার এবং স্থানীয় পর্যায়ে কমিউনিটি অ্যাম্বাসেডর নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি মসজিদ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ চলছে। এলাফ মসজিদে একটি ফুডব্যাংক চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সূত্রঃ ম্যানচেস্টার ইভনিং নিউজ
এমকে

