12.3 C
London
October 23, 2026
TV3 BANGLA
মুক্তমতযুক্তরাজ্য (UK)

ব্রেক্সিটের দশ বছর পর ব্রিটেনে নতুন গণভোটের দাবি: প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম কি যুক্তরাজ্যকে আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফিরিয়ে নিতে পারবেন?

নাশীত রহমান              II      লন্ডন    II               ২৩ অক্টোবর ২০২৬

 

ব্রেক্সিটের ঐতিহাসিক গণভোটের এক দশক পর ব্রিটেনের রাজনীতিতে আবারও ফিরে এসেছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—যুক্তরাজ্যের কি ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) ফিরে যাওয়া উচিত? আর যদি ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত কি পার্লামেন্টের মাধ্যমে নেওয়া হবে, নাকি আবারও জনগণের সরাসরি ভোটে নির্ধারিত হবে?

ব্রেক্সিট: যে সিদ্ধান্ত ব্রিটেনের রাজনৈতিক ইতিহাস বদলে দিয়েছিল – ২০১৬ সালের ২৩ জুন অনুষ্ঠিত গণভোটে ব্রিটিশ জনগণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের পক্ষে রায় দেয়। ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটের ফলাফল:-

Leave EU        ইইউ ত্যাগ          51.9%

Remain EU     ইইউতে থাকা       48.1%

 

এই ফলাফলের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন পদত্যাগ করেন। তাঁর উত্তরসূরি থেরেসা মে ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলেও পার্লামেন্টে চুক্তি অনুমোদনের প্রশ্নে একাধিকবার বাধার সম্মুখীন হন। পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের নেতৃত্বে ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করে। একই বছরের ৩১ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তীকালীন সময় শেষ হলে নতুন বাণিজ্য ও সীমান্তব্যবস্থা কার্যকর হয়।

ব্রেক্সিটের সমর্থকদের অন্যতম যুক্তি ছিল, ব্রিটেন তার আইন প্রণয়ন, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, সীমান্তব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যচুক্তির ওপর অধিকতর স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। অন্যদিকে ব্রেক্সিটবিরোধীরা সতর্ক করেছিলেন যে ইউরোপের বৃহৎ একক বাজার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ফলে বাণিজ্য ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। দশ বছর পর বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এই দুই ধরনের প্রত্যাশা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার তুলনা।

প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের নতুন রাজনৈতিক অবস্থান – ২০২৬ সালে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর অ্যান্ডি বার্নহাম ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের বিষয়ে নতুন আলোচনা শুরু করেছেন। ১২ অক্টোবর পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ব্রিটেনের বর্তমান ইইউ সম্পর্ককে অপরিবর্তিত রাখা যথেষ্ট নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অভিবাসন ব্যবস্থাপনা এবং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তিনি স্পষ্ট করেছেন, ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তে জনগণের মতামতই গুরুত্বপূর্ণ হবে। তবে এখনই নতুন গণভোট আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দেননি। বার্নহামের আলোচনায় প্রধানত তিনটি সম্ভাবনা উঠে এসেছে—বর্তমান ব্যবস্থার মধ্যে থেকে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করা, ইউরোপীয় একক বাজার বা কাস্টমস ইউনিয়নের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত পূর্ণ ইইউ সদস্যপদের সম্ভাবনা বিবেচনা করা। এই অবস্থান তাঁর পূর্বসূরি কিয়ার স্টারমারের সরকারের নীতি থেকে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ২০২৪ সালের লেবার পার্টির নির্বাচনী অঙ্গীকারে ইইউর একক বাজার, কাস্টমস ইউনিয়ন এবং অবাধ চলাচলব্যবস্থায় ফিরে না যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল। ২০২৬ সালের জুন মাসেও সরকার সেই সীমারেখা পুনর্ব্যক্ত করেছিল।

জনমত কি সত্যিই পরিবর্তিত হয়েছে? সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে ইউরোপীয় ইউনিয়নে পুনরায় যোগদানের প্রতি উল্লেখযোগ্য সমর্থন দেখা যাচ্ছে। তবে প্রশ্নের ভাষা, সম্ভাব্য সদস্যপদের শর্ত এবং গণভোটের সময়ের ওপর সমর্থনের মাত্রা পরিবর্তিত হয়। অক্টোবর ২০২৬-এ প্রকাশিত YouGov জরিপে এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র পাওয়া যায়।

অক্টোবর ২০২৬: নতুন গণভোট হলে কীভাবে ভোট দেবেন?

ইইউতে ফিরতে চান:                  ৫২%

ইইউর বাইরে থাকতে চান:           ২৭%

অনিশ্চিত:                             ১৫%

ভোট দেবেন না:                        ৭%

 

YouGov/The Times, ৪–৫ অক্টোবর ২০২৬; ২,৩১২ জন প্রাপ্তবয়স্কের ওপর জরিপ। শতাংশের সংখ্যা পূর্ণসংখ্যায় প্রকাশ করায় মোট ১০১% হয়েছে। YouGov/The Times; ২,৩১২ জন প্রাপ্তবয়স্ক, গ্রেট ব্রিটেন; জরিপ ৪–৫ অক্টোবর ২০২৬। প্রকাশিত শতকরা হার পূর্ণসংখ্যায় গোল করার কারণে যোগফলে সামান্য পার্থক্য রয়েছে।

এই জরিপে আরও দেখা যায়, সরকার যদি ইইউতে ফেরার একটি চুক্তি সম্পাদন করে, তাহলে ৬৪ শতাংশ উত্তরদাতা সেই চুক্তির ওপর গণভোট চান। বিপরীতে ২৩ শতাংশ মনে করেন, সরকার গণভোট ছাড়াই সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এখানে একটি বিশেষ দিক হলো, ইইউতে পুনরায় যোগদানের পক্ষের ভোটারদের মধ্যেও গণভোটের প্রতি সমর্থন রয়েছে। অর্থাৎ সদস্যপদের প্রশ্ন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের গণতান্ত্রিক পদ্ধতি—দুটি আলাদা বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর YouGov ট্র্যাকারেও দেখা যায়, ৫৯ শতাংশ উত্তরদাতা ইইউতে পুনরায় যোগদানের পক্ষে, আর ৩২ শতাংশ বিপক্ষে। কিন্তু পূর্ণ সদস্যপদ ছাড়াই ইইউর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পক্ষে সমর্থন আরও বেশি—৭৩ শতাংশ।

এর অর্থ, ব্রিটিশ জনগণের একটি বড় অংশ ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পক্ষে থাকলেও সবাই পূর্ণ সদস্যপদে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে একই অবস্থানে নেই।

ইইউতে ফিরে যাওয়ার অর্থনৈতিক যুক্তি: লাভ কোথায়, ঝুঁকি কোথায়? ব্রিটেনের অর্থনীতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ইইউ যুক্তরাজ্যের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার এবং ব্রিটিশ শিল্প, কৃষি, খাদ্য সরবরাহ, আর্থিক সেবা ও পরিবহন খাত ইউরোপীয় বাজারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ব্রেক্সিটের ফলে শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের অনেক সুবিধা বজায় থাকলেও নতুন কাস্টমস আনুষ্ঠানিকতা, পণ্যের উৎসসংক্রান্ত নিয়ম, নিয়ন্ত্রক মানের পার্থক্য এবং সীমান্তে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে বিভিন্ন ব্যবসার খরচ বেড়েছে।

ইইউ সদস্যপদে ফিরে গেলে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুবিধাগুলোর মধ্যে রয়েছে বাণিজ্যিক বাধা কমানো, সরবরাহব্যবস্থার উন্নতি, বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা হ্রাস এবং সেবা খাতে ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ। তবে পূর্ণ সদস্যপদে প্রত্যাবর্তনের অর্থনৈতিক ফলাফল নির্ভর করবে নতুন চুক্তির শর্ত, ব্রিটিশ অর্থনীতির কাঠামো এবং ইইউর সঙ্গে ভবিষ্যৎ নীতিগত সমন্বয়ের ওপর। ২০২৬ সালে UK in a Changing Europe গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণেও দেখানো হয়েছে, ইউরোপীয় একক বাজারে অংশগ্রহণ অর্থনৈতিক সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু তার সঙ্গে ইইউর বিধিবিধান গ্রহণ এবং মানুষের অবাধ চলাচলের মতো গুরুত্বপূর্ণ শর্ত জড়িত।

জাতীয় সার্বভৌমত্ব বনাম অর্থনৈতিক সুবিধা – ব্রেক্সিট বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো জাতীয় সার্বভৌমত্ব। ইইউ সদস্যপদের সমর্থকদের যুক্তি, বৃহৎ অর্থনৈতিক জোটের সদস্য হয়ে অভিন্ন আইন ও নীতি প্রণয়নে অংশ নেওয়া আন্তর্জাতিক প্রভাব বাড়াতে পারে। অন্যদিকে বিরোধীরা মনে করেন, স্বাধীনভাবে আইন, বাণিজ্য ও অভিবাসননীতি নির্ধারণের ক্ষমতা সীমিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ব্রিটেন যদি শুধু একক বাজারে ফিরে যায়, তাহলে বাজারের অনেক নিয়ম মানতে হলেও সেই নিয়ম প্রণয়নে পূর্ণ সদস্যদেশের মতো ভোটাধিকার নাও পেতে পারে। কিন্তু পূর্ণ ইইউ সদস্যপদ পেলে ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে। সুতরাং প্রশ্নটি শুধু অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির নয়; বরং ব্রিটেন কোন ধরনের সার্বভৌমত্ব, নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক প্রভাবকে অগ্রাধিকার দেবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন সদস্যপদে ব্রিটেন কি আগের সুবিধাগুলো ফিরে পাবে? ইইউতে পুনরায় যোগদানের আলোচনা যতই এগোক, একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো—২০২৬ সালের ইউরোপীয় ইউনিয়ন আর ২০১৬ সালের ইউরোপীয় ইউনিয়ন এক নয়। ব্রেক্সিটের আগে যুক্তরাজ্যের কয়েকটি বিশেষ সুবিধা ছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ইউরোপীয় বাজেটে বিশেষ ছাড়, ইউরো মুদ্রা গ্রহণ না করার ব্যবস্থা এবং কিছু বিচার ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাসংক্রান্ত নীতিতে বিশেষ অবস্থান। পুনরায় সদস্যপদের আবেদন করলে এসব সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিরে পাওয়া যাবে না।

বিশেষ করে নতুন সদস্যদেশের ক্ষেত্রে ইউরো গ্রহণের লক্ষ্যে অঙ্গীকারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তবে ইউরো গ্রহণের কোনো নির্দিষ্ট স্বয়ংক্রিয় সময়সীমা নেই; অর্থনৈতিক ও আইনগত শর্ত পূরণের বিষয় রয়েছে। একইভাবে নতুন সদস্যপদে ব্রিটেনকে ইইউর অবাধ চলাচল নীতি গ্রহণ করতে হতে পারে। এর ফলে ইইউ নাগরিকদের যুক্তরাজ্যে বসবাস ও কাজের অধিকার এবং ব্রিটিশ নাগরিকদের ইউরোপে সমপর্যায়ের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রশ্ন উঠবে। অ্যান্ড্রু গ্রাইস তাঁর নিবন্ধে এই বিষয়গুলোকেই নতুন গণভোটের আগে জনসমক্ষে পরিষ্কার করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।

ব্রেক্সিট ও অভিবাসন: দ্বিতীয় গণভোটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট প্রচারণায় অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ ছিল অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক বিষয়। ইইউ ত্যাগের পর যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় নাগরিকদের জন্য সাধারণভাবে অবাধ চলাচলব্যবস্থা বন্ধ করে একটি নতুন অভিবাসন কাঠামো চালু করে। কিন্তু ইইউতে পুনরায় যোগদানের অর্থ হবে অভিবাসনব্যবস্থায় আবার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।

এতে ব্রিটিশ নাগরিকদের জন্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চাকরি, ব্যবসা, পড়াশোনা ও বসবাসের সুযোগ সম্প্রসারিত হতে পারে। একই সঙ্গে ইইউ নাগরিকদের যুক্তরাজ্যে চলাচল ও বসবাসের অধিকারও বৃদ্ধি পাবে। তবে ইইউ নাগরিকদের অবাধ চলাচল এবং বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান বা অন্যান্য ইইউ-বহির্ভূত দেশের নাগরিকদের অভিবাসনব্যবস্থা এক বিষয় নয়। ইইউ সদস্যপদে ফিরে গেলেও তৃতীয় দেশের নাগরিকদের জন্য ব্রিটিশ অভিবাসন আইন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হবে না। ২০২৬ সালের জুন মাসের YouGov জরিপে ৪১ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেছেন, পুনরায় ইইউ সদস্যপদ গ্রহণ করলে অভিবাসন বাড়বে। বিপরীতে ৩৭ শতাংশ মনে করেছেন, অভিবাসনের পরিমাণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হবে না। এগুলো জনগণের প্রত্যাশা, প্রকৃত ভবিষ্যৎ অভিবাসনের পূর্বাভাস নয়।

প্রধানমন্ত্রী কি সাধারণ নির্বাচন ছাড়াই গণভোট আয়োজন করতে পারবেন? যুক্তরাজ্যের সাংবিধানিক ব্যবস্থায় গণভোট আয়োজনের জন্য সাধারণত পার্লামেন্টের আইনগত অনুমোদন প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী একক নির্বাহী সিদ্ধান্তে জাতীয় গণভোটের সব আইনগত ব্যবস্থা সম্পন্ন করতে পারেন না। গণভোটের প্রশ্ন, ভোটারদের যোগ্যতা, প্রচারণার নিয়ম এবং ফলাফলের আইনগত প্রভাব নির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করতে হবে। এখানে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচ্য।

প্রথমত, গণভোটে ইইউতে ফেরার পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া মানেই যুক্তরাজ্য সঙ্গে সঙ্গে সদস্য হয়ে যাবে না।

দ্বিতীয়ত, ইউরোপীয় ইউনিয়নে পুনরায় যোগদানের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন চুক্তির ৪৯ অনুচ্ছেদের অধীনে আবেদন করতে হবে। সদস্যপদে যোগদানের শর্ত নিয়ে আলোচনা এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

তৃতীয়ত, যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ সাংবিধানিক ও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে যোগদান চুক্তি অনুমোদন করতে হবে। সুতরাং একটি গণভোট রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক অনুমোদন দিতে পারে, কিন্তু সেটি আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদন ও সদস্যপদ অর্জনের বিকল্প নয়।

 

১৯৭৩ সালের ইতিহাস: গণভোট ছাড়াও কি ইইউতে যোগ দেওয়া সম্ভব? এই বিতর্কে একটি ঐতিহাসিক নজির বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের নেতৃত্বে যুক্তরাজ্য তৎকালীন ইউরোপীয় অর্থনৈতিক সম্প্রদায়ে (EEC) যোগ দেয়। এই সিদ্ধান্তের আগে কোনো জাতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়নি। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে সদস্যপদ বজায় রাখার প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং প্রায় ৬৭ শতাংশ ভোটার সদস্যপদ অব্যাহত রাখার পক্ষে ভোট দেন। এই ইতিহাস দেখায়, ব্রিটেনের ইউরোপীয় সংস্থায় যোগদানের ক্ষেত্রে গণভোট সব সময় পূর্বশর্ত ছিল না।

তবে ২০১৬ সালে গণভোটের মাধ্যমে ইইউ ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর পুনরায় সদস্যপদ গ্রহণের গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। গণভোটের সমর্থকরা মনে করেন, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের আগে আবার জনগণের অনুমোদন নেওয়া উচিত। অন্যদিকে সংসদীয় গণতন্ত্রের সমর্থকদের একটি অংশ যুক্তি দেন, স্পষ্ট নির্বাচনী ইশতেহারের ভিত্তিতে নির্বাচিত সরকার ও পার্লামেন্টও এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার বৈধ সাংবিধানিক ক্ষমতা রাখে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য মূলত আইনগত ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার।

জনমতের সবচেয়ে বড় জটিলতা: পুরোনো সুবিধা ছাড়া ইইউতে ফেরার প্রশ্ন – ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফিরে যাওয়ার প্রতি সমর্থন থাকলেও সেই সমর্থন কতটা দৃঢ়, তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। ২০২৬ সালের জুন মাসে YouGov পরিচালিত একটি জরিপে দেখা যায়, সাধারণভাবে ৫৫ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক ইইউতে ফিরে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু ব্রিটেন যদি আগের বিশেষ ছাড় ও সুবিধাগুলো ছাড়া সদস্যপদ গ্রহণ করে, তাহলে সমর্থন কমে দাঁড়ায় মাত্র ৩৫ শতাংশে। সেই পরিস্থিতিতে ৪৩ শতাংশ বিরোধিতা করেন। এই তথ্য নতুন গণভোটের বিতর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ জনগণের সামনে শুধু ‘ইইউতে ফিরবেন, নাকি বাইরে থাকবেন’—এমন সাধারণ প্রশ্ন রাখা এবং একটি নির্দিষ্ট সদস্যপদ চুক্তির ওপর ভোট চাওয়া এক বিষয় নয়। ইউরো মুদ্রা, অভিবাসন, ইইউ বাজেটে অর্থ প্রদান, আইন প্রণয়নের ক্ষমতা এবং বাণিজ্যিক সুবিধার মতো বিষয়গুলো ভোটারদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে গণভোট আয়োজনের আগে সম্ভাব্য সদস্যপদের শর্ত সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন হবে।

লেবার পার্টির ভেতরে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ – প্রধানমন্ত্রী বার্নহামের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ তাঁর নিজের দল।

২০১৬ সালের গণভোটে ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চল ও মিডল্যান্ডসের অনেক ঐতিহ্যবাহী লেবার-সমর্থিত এলাকায় ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট পড়েছিল। এসব এলাকার ভোটারদের একটি অংশ জাতীয় সার্বভৌমত্ব, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রত্যাশায় ইইউ ত্যাগ সমর্থন করেছিলেন। অন্যদিকে লেবার পার্টির শহরাঞ্চলীয়, তরুণ ও বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষিত সমর্থকদের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি তুলনামূলক ইতিবাচক মনোভাব দেখা যায়।

বার্নহামকে তাই একই সঙ্গে দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতা মোকাবিলা করতে হবে। The Independent-এর নিবন্ধ অনুযায়ী, লেবার পার্টির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা আশঙ্কা করছেন, পূর্ণ ইইউ সদস্যপদে ফিরে যাওয়ার উদ্যোগ ব্রেক্সিট-সমর্থিত নির্বাচনী এলাকাগুলোতে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে বার্নহামের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি দীর্ঘমেয়াদে ইইউতে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন।  কনজারভেটিভ পার্টি এবং রিফর্ম ইউকের মতো রাজনৈতিক শক্তিগুলোও এই বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশেষত জাতীয় সার্বভৌমত্ব, অভিবাসন এবং ২০১৬ সালের গণভোটের রায়কে সম্মান করার প্রশ্নে তাদের অবস্থান নতুন গণভোটের রাজনৈতিক পরিবেশকে প্রভাবিত করবে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন কি ব্রিটেনকে আবার গ্রহণ করবে? ব্রিটেনের জনগণ পুনরায় যোগদানের পক্ষে ভোট দিলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্মতি ছাড়া সদস্যপদ সম্ভব নয়। বর্তমান ২৭টি সদস্যরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্তরাজ্যকে নতুন সদস্যপদের শর্ত নিয়ে আলোচনা করতে হবে। ইইউর দৃষ্টিকোণ থেকে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে—ব্রিটেন ভবিষ্যতে সদস্যপদ নিয়ে স্থিতিশীল রাজনৈতিক অঙ্গীকার বজায় রাখবে কি না, ইইউর অভিন্ন আইন ও নীতি গ্রহণে কতটা প্রস্তুত, এবং আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনে সম্মত কি না। ইউরোপীয় ইউনিয়নও ব্রেক্সিটের পর পরিবর্তিত হয়েছে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, যৌথ ঋণ গ্রহণ, শিল্পনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং নিরাপত্তা প্রশ্নে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে পুনরায় যোগদানের আলোচনা শুধু পুরোনো সদস্যপদ ফিরিয়ে আনার বিষয় নয়; বরং পরিবর্তিত একটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক নির্ধারণের বিষয়।

ব্রিটেনের সামনে সম্ভাব্য পথগুলো

সম্ভাব্য ব্যবস্থা প্রধান বৈশিষ্ট্য
বর্তমান সম্পর্ক বজায় রাখা বিদ্যমান বাণিজ্য ও সহযোগিতা চুক্তির ভিত্তিতে সম্পর্ক
সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করা বাণিজ্যিক বাধা কমানো, নিরাপত্তা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধি
কাস্টমস ইউনিয়নে যোগদান পণ্যবাণিজ্যে কিছু বাধা কমানো; স্বাধীন বাণিজ্যনীতিতে সীমাবদ্ধতা
একক বাজারে অংশগ্রহণ বাজারে প্রবেশাধিকারের বিস্তার; ইইউর বহু নিয়ম এবং অবাধ চলাচলের শর্ত
পূর্ণ ইইউ সদস্যপদ ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার ও সদস্যপদের পূর্ণ দায়িত্ব

 

এই বিকল্পগুলোর অর্থনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রভাব এক নয়। ফলে কোন ব্যবস্থাটি যুক্তরাজ্যের জন্য গ্রহণযোগ্য হবে, তা নির্ভর করবে জনমত, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং ইইউর সঙ্গে আলোচনার ফলাফলের ওপর।

গণভোটের প্রশ্নে ব্রিটেনের সামনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত

প্রথমত, সরকারকে নির্ধারণ করতে হবে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নই তার চূড়ান্ত লক্ষ্য, নাকি পূর্ণ সদস্যপদে প্রত্যাবর্তন।

দ্বিতীয়ত, জনগণের কাছে কোনো নির্দিষ্ট সদস্যপদ চুক্তি উপস্থাপন করা হবে, নাকি নীতিগতভাবে পুনরায় যোগদানের অনুমোদন চাওয়া হবে।

তৃতীয়ত, গণভোটের আগে প্রয়োজনীয় আলোচনা ও সমঝোতা কতদূর সম্পন্ন করা সম্ভব, সেটিও নির্ধারণ করতে হবে।

এখানে সময়ের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান পার্লামেন্টের স্বাভাবিক মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত চলতে পারে। তবে সাধারণ নির্বাচন এবং গণভোট দুটি পৃথক সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। প্রয়োজনীয় সংসদীয় অনুমোদন পাওয়া গেলে সাধারণ নির্বাচনের আগেও গণভোটের আয়োজন সম্ভব।

ব্রেক্সিটের দশ বছর পর নতুন রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে ব্রিটেন – ব্রেক্সিট ছিল আধুনিক ব্রিটিশ ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এর মাধ্যমে যুক্তরাজ্য প্রায় পাঁচ দশকের ইউরোপীয় একীভূতকরণ প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে আসে। দশ বছর পর সেই সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলো দেখাচ্ছে, ব্রিটিশ জনগণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার পক্ষে। পূর্ণ সদস্যপদে প্রত্যাবর্তনের প্রতিও সমর্থন রয়েছে। কিন্তু পুরোনো বিশেষ সুবিধা ছাড়া সদস্যপদ গ্রহণ, অভিবাসন এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের মতো প্রশ্নে জনমত এখনও বিভক্ত।

প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের সামনে তাই শুধু একটি গণভোট আয়োজনের প্রশ্ন নয়; বরং ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অবস্থান, ইউরোপের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং জনগণের গণতান্ত্রিক সম্মতির একটি জটিল সিদ্ধান্ত রয়েছে। ২০১৬ সালে ব্রিটিশ জনগণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করার। ২০২৬ সালে নতুন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে—পরিবর্তিত বাস্তবতায় সেই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন আছে কি না এবং থাকলে কোন শর্তে ও কোন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তা করা হবে। এই প্রশ্নের উত্তর শুধু ব্রিটেনের ইউরোপীয় সম্পর্ক নয়, আগামী কয়েক দশকের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক গতিপথও প্রভাবিত করতে পারে।

  1. তথ্যসূত্রওপ্রাসঙ্গিকপ্রতিবেদন
  2. ১. The Independent — Burnham should call a referendum on the EU – he’d win it — Andrew Grice, ১৯ অক্টোবর ২০২৬।
  3. ২. YouGov — Should Britain hold a referendum before rejoining the EU? — অক্টোবর ২০২৬-এর জরিপ।
  4. YouGov — How strong is UK support for rejoining the European Union? — সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর জনমত বিশ্লেষণ।
  5. YouGov — What do Britons think of Brexit, 10 years since the referendum? — জুন ২০২৬।
  6. House of Commons Library — Debate on the UK applying to join the European Union — সংসদীয় গবেষণা ও নীতিগত পটভূমি।

 

 

আরো পড়ুন

নতুন ওষুধে বাড়তি ব্যয়ের চাপ এনএইচএসেঃ স্বাস্থ্যসেবা সংকটের সতর্কবার্তা গবেষকদের

যুক্তরাজ্যের কাজের সুযোগ বাড়ানোই এখন উপযুক্ত সময়ঃ লিজ কেন্ডাল

ইসলামিক মর্গেজের মাধ্যমে প্রপার্টি ক্রয়