11.9 C
London
October 16, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষায় আইন করে উল্টো বিপাকে যুক্তরাজ্য সরকারঃ বাড়ছে বাড়িভাড়া

যুক্তরাজ্যে ভাড়াটিয়াদের অধিকার সুরক্ষায় নতুন আইন চালুর পর বেসরকারি ভাড়ার বাজারে উল্টো সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ। বাড়িওয়ালাদের ওপর বাড়তি বিধিনিষেধ ও ব্যয়ের চাপ বাড়ায় অনেকে ভাড়ার ব্যবসা ছেড়ে দিচ্ছেন। এতে ভাড়ার বাড়ির সরবরাহ কমছে, বাড়ি পেতে প্রতিযোগিতা বাড়ছে এবং ভাড়ার দামও ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভাড়াটিয়াদের অধিকার আইন চালুর প্রায় ছয় মাস পর এর অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আইনটির উদ্দেশ্য ছিল ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষা বাড়ানো এবং ভাড়ার মূল্য নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করা। কিন্তু বাড়িওয়ালাদের বাজার ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতায় পরিস্থিতি উল্টো দিকে যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সম্পত্তি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান টোয়েন্টি-সিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ৫৬২টি বাড়ি বেসরকারি ভাড়ার বাজার থেকে বেরিয়ে গেছে। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৪৯৫টি। দশকের শুরুতে প্রতিদিন এমন বাড়ি বাজার থেকে সরে যাওয়ার সংখ্যা ছিল মাত্র ১৬৭টি।

বাড়িওয়ালাদের বাজার ছাড়ার পেছনে কয়েক বছরের কমে যাওয়া মুনাফা, বাড়তি পরিচালন ব্যয় এবং নতুন আইনের বিধিনিষেধকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সম্পত্তি সংস্থা বেনহাম অ্যান্ড রিভসের পরিচালক মার্ক ফন গ্রুন্ডহের বলেন, বাড়ির সরবরাহ কমতে থাকলে অথচ ভাড়াটিয়াদের চাহিদা শক্তিশালী থাকলে সীমিতসংখ্যক বাড়ির জন্য প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে।

নতুন আইন কার্যকরের পর ভাড়ার দাম বাড়ার প্রবণতাও দেখা গেছে। দ্য লেটিং পার্টনারশিপের বিশ্লেষণে অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকসের তথ্য অনুযায়ী, আইন কার্যকরের আগের তিন মাসে ভাড়া বেড়েছিল ০.৮ শতাংশ। পরের তিন মাসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১.২ শতাংশে।

অন্যদিকে, স্পেয়াররুমের ভাড়া সূচক অনুযায়ী, জুন পর্যন্ত তিন মাসে যুক্তরাজ্যের নয়টি অঞ্চলের মধ্যে ছয়টিতে ভাড়া রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। দেশজুড়ে একটি কক্ষ ভাড়া নেওয়ার গড় মাসিক খরচ দাঁড়িয়েছে ৭৬২ পাউন্ড। গত তিন বছরে যুক্তরাজ্যে ভাড়া প্রায় ৭ শতাংশ বেড়েছে বলেও প্রতিষ্ঠানটির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

নতুন আইনে বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করা ভাড়ার চেয়ে বেশি অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব গ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সম্ভাব্য ভাড়াটিয়াদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক দর হাঁকানোর প্রবণতা বন্ধ করাই ছিল এ পদক্ষেপের উদ্দেশ্য। তবে বাড়িওয়ালারা শুরুতেই বেশি ভাড়া নির্ধারণ করে সেই দামের সমান বা তার নিচে প্রস্তাব দেওয়ার জন্য ভাড়াটিয়াদের আহ্বান জানাতে পারেন।

আইন সংস্থা ডিএমএইচ স্ট্যালার্ডের আইনজীবী ইয়ান নারবেথ বলেন, কোনো বাড়ির উপযুক্ত মাসিক ভাড়া ১ হাজার ৫০০ পাউন্ড হলেও সেটি ১ হাজার ৭৫০ পাউন্ডে বিজ্ঞাপন দিয়ে সম্ভাব্য ভাড়াটিয়াদের ওই দামের সমান বা তার নিচে সর্বোচ্চ প্রস্তাব দিতে বলা হচ্ছে। এভাবে বেশি দাম চাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।

প্রপার্টি সংস্থা চেস্টারটনসের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে চাওয়া ভাড়ার পরিমাণ বাড়িয়েছেন এমন বাড়িওয়ালার সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ৩৬ শতাংশ বেড়েছে।

বাড়ি ভাড়া পাওয়ার প্রতিযোগিতা বাড়ায় আবেদনকারীদের মধ্যেও পরিবর্তন এসেছে। বাড়িওয়ালাদের আকৃষ্ট করতে অনেকে নিজেদের পরিচিতি ও ছবি দিয়ে আবেদন করছেন। রিচমন্ডভিত্তিক সম্পত্তি সংস্থা অ্যান্টনি রবার্টসের ভাড়া ব্যবস্থাপক হ্যারিয়েট স্ক্যানলান বলেন, বাড়ি পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়াতে ভাড়াটিয়াদের ব্যক্তিগত বিবরণ ও ছবি সংযুক্ত করার প্রবণতা বেড়েছে।

নতুন আইনে সরকারি ভাতা গ্রহণ করেন কিংবা সন্তান রয়েছে—এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ভাড়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে বাড়িওয়ালারা আবেদনকারীর বেতন, চাকরির মেয়াদ এবং গ্যারান্টর আছে কি না, সে সম্পর্কে তথ্য চাইতে পারেন। আর্থিক সামর্থ্য যাচাইয়ে প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করতে না পারলে আবেদন প্রত্যাখ্যান করার সুযোগও রয়েছে।

হ্যারিয়েট স্ক্যানলান বলেন, আগে যুক্তরাজ্যে নতুন আসা কোনো ব্যক্তি চাকরি শুরু না করলেও সঞ্চয় থাকলে এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক গ্যারান্টর না থাকলে ১২ মাসের ভাড়া অগ্রিম দেওয়ার প্রস্তাব দিতে পারতেন। এখন বিষয়টি অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে এ ধরনের আবেদনকারীদের বাড়িওয়ালাদের বিবেচনায় নেওয়াও কঠিন হতে পারে।

বাড়িওয়ালাদের জন্য আরও বিধিনিষেধ আসছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন জাতীয় নিবন্ধনব্যবস্থা ২০২৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর থেকে ধাপে ধাপে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ওয়েস্ট মিডল্যান্ডস অঞ্চলে এটি শুরু হওয়ার কথা। নিবন্ধনের সময়সীমা সম্পত্তির অবস্থান অনুযায়ী নির্ধারিত হবে এবং প্রতিটি সম্পত্তির জন্য বছরে ৬৫ পাউন্ড ফি দিতে হবে।

নিবন্ধনের সময় বাড়ির ঠিকানা, কক্ষের সংখ্যা, ভাড়াটিয়ার সংখ্যা, প্রাপ্ত ভাড়ার পরিমাণ এবং গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দক্ষতার সনদের মতো তথ্য দিতে হবে। এ ছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে বেসরকারি ভাড়ার বাড়িগুলোকে আরও উচ্চ জ্বালানি দক্ষতার মান পূরণ করতে হবে। এ শর্ত পূরণে বাড়িওয়ালাদের সর্বোচ্চ ১০ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মার্ক ফন গ্রুন্ডহের বলেন, এক বা দুটি ভাড়ার বাড়ির মালিকের পক্ষে বাড়তি আইনগত, ব্যবস্থাপনাগত, বিমা ও নিয়ম মেনে চলার ব্যয় বহন করা বড় সম্পত্তি পোর্টফোলিওর মালিকদের তুলনায় অনেক কঠিন। ফলে কারও কারও জন্য ভাড়ার বাজারে টিকে থাকা আর লাভজনক নাও হতে পারে।

ভাড়ার বাড়ি খোঁজার ওয়েবসাইট স্পেয়াররুমের ম্যাট হাচিনসন বলেন, কিছু বাড়িওয়ালা এখনই সম্পত্তি বিক্রি না করলেও বর্তমান ভাড়াটিয়া চলে যাওয়ার পর আর নতুন কাউকে ভাড়া দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন না।

প্যারাগন ব্যাংকের বন্ধকী ঋণ বিভাগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লুইসা সেডউইক বলেন, আবাসন খাতে মান উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে বিধিনিষেধের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে দায়িত্বশীল বাড়িওয়ালারা যাতে বাজারে থাকতে এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বিনিয়োগ করতে পারেন, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।

সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ

এমকে

আরো পড়ুন

সাবস্ক্রিপশন ও সরকারি অনুদান দ্বারা প্রতিস্থাপিত হবে বিবিসির লাইসেন্স ফি

অনলাইন ডেস্ক

অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে যুক্তরাজ্যের বাড়িভাড়া

যুক্তরাজ্যের হিথ্রো বিমানবন্দরে আকস্মিক বন্যাঃ যাত্রীদের গাড়ি নয়, ট্রেনে যাওয়ার পরামর্শ