TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

ভেনেজুয়েলা থেকে গ্রিনল্যান্ডঃ সাম্রাজ্যবাদে ফেরার পথে যুক্তরাষ্ট্র

বিশ্ব রাজনীতিতে একটি গভীর রূপান্তরের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলা, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য আধিপত্যবাদী ঘোষণা এবং ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর নীরবতা—সব মিলিয়ে একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার দিকেই এগোচ্ছে বিশ্ব। বিশ্লেষকদের মতে, এই আগ্রাসন কেবল শক্তি প্রদর্শন নয়; বরং একটি ক্ষয়িষ্ণু সাম্রাজ্যের রোগলক্ষণ।

 

ভেনেজুয়েলার আকাশে বোমাবর্ষণ ও দেশটির নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সরাসরি হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন হলেও ইউরোপের প্রতিক্রিয়া ছিল দুর্বল ও অনিশ্চিত। ট্রাম্প প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি ভেনেজুয়েলা ‘চালাবেন’। এই বক্তব্যকে অনেকেই একটি আত্মবিশ্বাসী পরাশক্তির নয়, বরং অবক্ষয়ের পথে থাকা সাম্রাজ্যের নগ্ন আত্মপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন।

ট্রাম্পের রাজনীতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো তার অকপটতা। আগের মার্কিন শাসকেরা সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থকে ‘গণতন্ত্র’ ও ‘মানবাধিকারের’ ভাষায় আড়াল করলেও ট্রাম্প সে ভণিতা করেন না। তিনি প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন, ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ দখল করাই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য। এই দৃষ্টিভঙ্গি যুক্তরাষ্ট্রের সদ্য প্রকাশিত জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্রেও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।

এই কৌশলপত্রে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র কার্যত স্বীকার করেছে যে তাদের বৈশ্বিক আধিপত্যের যুগ শেষ হয়ে এসেছে। শীতল যুদ্ধ–পরবর্তী সময়ের একক নেতৃত্বের ধারণা আর টেকসই নয় বলে সেখানে বলা হয়েছে। গোটা বিশ্বকে নিজের কাঁধে বহন করার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের আর নেই—এই বাস্তবতাও সেখানে মেনে নেওয়া হয়েছে।

নতুন কৌশল অনুযায়ী, বৈশ্বিক আধিপত্যের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র এখন অঞ্চলভিত্তিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পথে হাঁটছে। এই পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবক্ষেত্র হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে পুরো আমেরিকা মহাদেশ। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে বহুদিন পর আবার সক্রিয় করা হচ্ছে মনরো নীতি, যার মাধ্যমে পশ্চিম গোলার্ধে বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপ ঠেকানোর কথা বলা হয়েছিল।

বাস্তবে মনরো নীতির ফল হয়েছিল ভিন্ন। ইউরোপীয় উপনিবেশ ঠেকানোর অজুহাতে লাতিন আমেরিকার দেশগুলো ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবাধীন অঞ্চলে পরিণত হয়। চিলিতে সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট সালভাদর আয়েন্দেকে উৎখাতে সহায়তা, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাসহ একাধিক দেশে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের পৃষ্ঠপোষকতা—সবই এই নীতির বাস্তব রূপ।

তবে গত তিন দশকে এই আধিপত্যে বড় ধাক্কা আসে। ব্রাজিলসহ একাধিক দেশে প্রগতিশীল সরকার ক্ষমতায় এসে আঞ্চলিক স্বাধীনতা জোরদার করে। একই সময়ে চীন লাতিন আমেরিকায় অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে। এই পরিস্থিতি উল্টে দিতেই ভেনেজুয়েলায় সামরিক হামলাকে ট্রাম্পের প্রথম বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তিনি ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর সঙ্গে একধরনের অঘোষিত সমঝোতায় ছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে সেই ভারসাম্য আর নেই। এবার তিনি শুধু কথায় নয়, কার্যকরভাবে চরম ডানপন্থী ও কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠার পথে এগোচ্ছেন। মেক্সিকো, কলম্বিয়া ও কিউবার নির্বাচিত সরকারগুলোর বিরুদ্ধে তার হুমকি সেই বাস্তবতারই ইঙ্গিত।

গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রকাশ্য আগ্রহ ইউরোপের জন্য বড় সংকেত হয়ে উঠেছে। ডেনমার্কের সার্বভৌম ভূখণ্ডে হস্তক্ষেপ হলে যৌথ প্রতিরক্ষার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ন্যাটো জোট কার্যত ভেঙে পড়তে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেনে রাশিয়ার ভূমি দখলের মতোই যুক্তরাষ্ট্রও শক্তির জোরে ইউরোপীয় ভূখণ্ড দখল করতে পারে, আর তখন ইউরোপ কেবল দুর্বল প্রতিবাদেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

এই প্রেক্ষাপটে ইউক্রেন নিয়ে ট্রাম্পের নরম অবস্থান নতুন ব্যাখ্যা পাচ্ছে। ২০১৯ সালে আলোচনায় আসে, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেন থেকে সরে এলে রাশিয়া ভেনেজুয়েলায় মার্কিন প্রভাব মেনে নেবে—এমন একটি প্রস্তাব। সেই সমঝোতা বাস্তবায়িত হয়েছে কি না জানা না গেলেও, শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রভাবক্ষেত্র ভাগাভাগির প্রবণতা যে বাস্তব, তা স্পষ্ট।

বিশ্লেষকদের মতে, একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠছে—যেখানে ক্ষমতাধর কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রগুলো প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে এবং তাদের সম্পদ দখল করবে। একসময় যা কল্পনার দুঃস্বপ্ন মনে হতো, আজ তা বাস্তব হয়ে উঠছে। এখন প্রশ্ন একটাই—এই প্রবণতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো বৈশ্বিক ইচ্ছা, ঐক্য ও শক্তি কি আদৌ অবশিষ্ট আছে?

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

পুতিনের বেশে অন্তত তিনজন, দাবি ইউক্রেনের গোয়েন্দাদের

ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণ, পদত্যাগে ‘বাধ্য’ হলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিবেক

গ্রিসে নতুন নিয়ম, স্কুলে মোবাইল ব্যবহার করলে শাস্তি