সৌদি আরবের মদিনা অঞ্চলে আনুমানিক ১১ কোটি টন বা ১১০ মিলিয়ন টন ইউরেনিয়ামসমৃদ্ধ আকরিকের সন্ধান পাওয়া গেছে। একই খনিজ ভাণ্ডারে উচ্চ ঘনত্বের ভারী বিরল খনিজের উপস্থিতিও শনাক্ত হয়েছে। সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুলআজিজ বিন সালমান ১৪ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সাধারণ সম্মেলনে এ তথ্য জানান।
সৌদি সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, মদিনা অঞ্চলের জাবাল সাইয়িদ প্রকল্পে ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে এই খনিজসম্পদের সন্ধান পাওয়া যায়। সেখানে উচ্চ ঘনত্বের বিরল খনিজ, বিশেষ করে ভারী বিরল খনিজ উপাদানের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য ইউরেনিয়াম থাকার সম্ভাবনা শনাক্ত হয়েছে। সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী এটিকে বিশ্বের উন্নয়নাধীন গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজসম্পদ প্রকল্পগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তবে ১১ কোটি টনকে খাঁটি ইউরেনিয়ামের পরিমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ইউরেনিয়াম ও বিরল খনিজসমৃদ্ধ আকরিকের মোট পরিমাণ। আকরিকের মধ্যে ইউরেনিয়ামের প্রকৃত ঘনত্ব কত এবং বাণিজ্যিকভাবে এর কতটা উত্তোলন করা সম্ভব—সৌদি কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে বিস্তারিত পরিমাণ এখনো প্রকাশ করেনি। ফলে আবিষ্কৃত ১১ কোটি টন আকরিকের পুরোটাই ব্যবহারযোগ্য ইউরেনিয়াম নয়।
আইএইএর তথ্যেও জাবাল সাইয়িদকে সৌদি আরবের ইউরেনিয়াম অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২২ সালের আইএইএ-ওইসিডি নিউক্লিয়ার এনার্জি এজেন্সির যৌথ প্রতিবেদনে জাবাল সাইয়িদ এলাকায় ৩৪ মিলিয়ন টন ‘ইনফার্ড’ ইউরেনিয়ামসম্পদ এবং গড়ে প্রতি মিলিয়নে ৪১৫ অংশ ইউরেনিয়াম গ্রেডের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছিল।
নতুন আবিষ্কারের ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো, যখন সৌদি আরব তার জ্বালানি ও খনিজ খাতকে আরও সম্প্রসারণের পাশাপাশি অর্থনীতিকে তেলনির্ভরতা থেকে বহুমুখী করার উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছে। দেশটির ভিশন ২০৩০ পরিকল্পনার আওতায় খনিজসম্পদ উন্নয়ন ও পারমাণবিক শক্তিকে ভবিষ্যৎ জ্বালানি ব্যবস্থার অংশ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে দেশে ইউরেনিয়াম অনুসন্ধান ও উত্তোলনের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছে। দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী জানিয়েছেন, সৌদি আরব তার পারমাণবিক কর্মসূচিকে বেসামরিক উদ্দেশ্যে এগিয়ে নিতে চায়। বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক ব্যবহারের জন্য ভবিষ্যতে স্থানীয়ভাবে পারমাণবিক জ্বালানি তৈরির সক্ষমতা গড়ে তোলার পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও ইউরেনিয়ামসম্পদ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়েও অগ্রগতি হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাইয়ে দুই দেশ বেসামরিক পারমাণবিক শক্তি সহযোগিতার বিষয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছায়। এর মাধ্যমে সৌদি আরবে পারমাণবিক চুল্লি ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় খনি কোম্পানি মাআদিনও বিরল খনিজ ও ইউরেনিয়ামসম্পদ উন্নয়নের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এমপি ম্যাটেরিয়ালসের সঙ্গে মাআদিনের অংশীদারত্বের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যার লক্ষ্য বিরল খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ইউরেনিয়াম উৎপাদনের সক্ষমতা উন্নয়ন।
সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী আইএইএ সম্মেলনে বলেন, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হবে না। সৌদি আরব একটি পূর্ণাঙ্গ পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তুলতে চায়, যার উদ্দেশ্য হবে বেসামরিক ব্যবহার।
জাবাল সাইয়িদে পাওয়া এই আকরিক ভবিষ্যতে সৌদি আরবের খনিজ ও জ্বালানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে আকরিকের প্রকৃত ইউরেনিয়াম ঘনত্ব, উত্তোলনযোগ্য মজুত, প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যয় এবং বাণিজ্যিকভাবে কতটা সম্পদ ব্যবহার করা সম্ভব—এসব বিষয়ে আরও বিস্তারিত অনুসন্ধান ও মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই আবিষ্কার সৌদি আরবের খনিজসম্পদ উন্নয়ন এবং বেসামরিক পারমাণবিক শক্তি কর্মসূচির সঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দেশটি একই সঙ্গে বিরল খনিজ ও ইউরেনিয়ামসম্পদকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যৎ জ্বালানি ও শিল্প খাতের সক্ষমতা বাড়ানোর পথে এগোচ্ছে।
সূত্রঃ রয়টার্স / দ্য ন্যাশনাল আরব নিউজ
এম.কে

