12.3 C
London
October 18, 2026
TV3 BANGLA
বাংলাদেশ

মাতারবাড়ী বন্দর ঘিরে জাপানের পরিকল্পনাঃ বাংলাদেশের ওপর বাড়বে ভারতের নির্ভরতা

বাংলাদেশের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। জাপানের সহযোগিতায় বন্দর ও যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন হলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্য, নেপাল ও ভুটানের পণ্য পরিবহনে বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়তে পারে। এতে বন্দর ফি, পরিবহন, গুদামজাতকরণ ও লজিস্টিকস খাতে আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

আগামী ২৬ অক্টোবর জাপান সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। সফরকে সামনে রেখে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ সম্প্রসারণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। আলোচনায় রয়েছে ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি সম্ভাব্য বিনিয়োগ ও সহযোগিতা প্যাকেজ, যার আওতায় মাতারবাড়ীসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ও শিল্প খাতে অর্থায়নের প্রস্তাব থাকতে পারে।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্য—আসাম, অরুণাচল প্রদেশ, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও ত্রিপুরা—ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সীমিত স্থলসংযোগের কারণে দীর্ঘদিন ধরে পরিবহনগত চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এই অঞ্চলের সঙ্গে বঙ্গোপসাগর ও আন্তর্জাতিক বাজারের যোগাযোগ সহজ করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

বাংলাদেশের সড়ক, রেলপথ, নৌপথ ও সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে পণ্য পরিবহনের সুযোগ বাড়লে উত্তর-পূর্ব ভারতের ব্যবসায়ীরা বিকল্প বাণিজ্যপথ পেতে পারেন। বিশেষ করে আসাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয়ের উৎপাদিত পণ্য বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে সমুদ্রবন্দরে পৌঁছাতে পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়বে। তবে এ ব্যবস্থা কার্যকর করতে দুই দেশের মধ্যে ট্রানজিট চুক্তি, শুল্কনীতি এবং অবকাঠামোগত সমন্বয় প্রয়োজন।

মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনার সক্ষমতা বাড়তে পারে। গভীর সমুদ্রগামী বড় জাহাজ পরিচালনার উপযোগী অবকাঠামো তৈরি হলে নির্দিষ্ট কিছু রুটে বিদেশি ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ থাকবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা ও জাহাজ চলাচলের সীমাবদ্ধতার কারণে কিছু পণ্য ছোট জাহাজে করে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া কিংবা শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দরে নিয়ে বড় জাহাজে স্থানান্তর করা হয়।

মাতারবাড়ী বন্দরের কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় কমতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানির আগ্রহ বৃদ্ধি, রপ্তানি বাণিজ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা উন্নয়ন এবং বন্দরকেন্দ্রিক শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পরিবহন ব্যয় ৫৭ শতাংশ কমা কিংবা ইউরোপ-আমেরিকায় পণ্য পৌঁছানোর সময় ৪৫ দিন থেকে ২৩ দিনে নেমে আসার দাবির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট রুট ও পণ্যভিত্তিক নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।

জাপান দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা—জাইকা—পরিবহন, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোর বিভিন্ন প্রকল্পে সহায়তা দিয়ে আসছে। মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে বন্দর, বিদ্যুৎ, সড়ক যোগাযোগ ও শিল্পাঞ্চলের উন্নয়ন হলে বাংলাদেশে বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক যোগাযোগ সম্প্রসারিত হলে ট্রানজিট ফি, কার্গো হ্যান্ডলিং, গুদামজাতকরণ, পরিবহন ও অন্যান্য লজিস্টিকস সেবা থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। নেপাল ও ভুটানের পণ্য পরিবহনেও বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহারের সুযোগ সম্প্রসারণ করা গেলে আঞ্চলিক বাণিজ্যে দেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।

এই যোগাযোগব্যবস্থা বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বও বাড়াতে পারে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ও বন্দর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো আরও গুরুত্ব পেতে পারে। তবে ট্রানজিট সুবিধা বন্ধ করে দেওয়াকে সরাসরি চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলে চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা, বাণিজ্যিক ক্ষতি ও পাল্টা প্রতিক্রিয়ার বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে ১৪ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ প্রস্তাব বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। প্রস্তাবটির আওতায় কোন কোন খাতে অর্থায়ন হবে, কী পরিমাণ অর্থ ঋণ, অনুদান বা সরাসরি বিনিয়োগ হিসেবে আসবে এবং প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে কত সময় লাগবে—এসব বিষয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে। প্রস্তাবিত অর্থায়নকে আনুষ্ঠানিক চুক্তি বা নিশ্চিত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করার আগে সরকারি ঘোষণা ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর বাংলাদেশের জন্য আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। জাপানের সহযোগিতা, ভারতের সঙ্গে কার্যকর ট্রানজিট ব্যবস্থা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হয়ে উঠতে পারে।

সূত্রঃ জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা

এমকে

আরো পড়ুন

বন্যা ইস্যুতে ৪৪ এনজিওর সঙ্গে বৈঠকে ড. ইউনূস

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতিঃ চার দশক পর আবারও প্রার্থী বাংলাদেশ

জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব পদে আলোচনায় ড. ইউনূস