TV3 BANGLA
বাংলাদেশ

‘মুজিব ভাই’ বিতর্কঃ ৪২ কোটি কীভাবে ৪ হাজার কোটির গুজবে রূপ নিল

নির্বাচন ও চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতাকে ছাপিয়ে হঠাৎ করেই তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে ‘মুজিব ভাই’ নামের একটি অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র। গত ৯ জানুয়ারি দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে দাবি করা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই একটি সিনেমা নির্মাণে ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ২১১ কোটি টাকা। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভ ও বিস্ময়ের সৃষ্টি করে এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের ‘লুটপাট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

এই দাবির সূত্র হিসেবে গণমাধ্যমগুলো উল্লেখ করে সরকারের প্রকাশিত একটি ‘শ্বেতপত্র’। ডাক ও টেলিযোগাযোগ খাতে গত ১৫ বছরে দুর্নীতি, অনিয়ম ও কাঠামোগত দুর্বলতা অনুসন্ধান করে অন্তর্বর্তী সরকার ৫ জানুয়ারি ৩ হাজার ২৭২ পৃষ্ঠার এই শ্বেতপত্র প্রকাশ করে, যা ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত করা হয়। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও দুর্নীতি প্রতিরোধে নীতিগত দিকনির্দেশনা দিতেই এই দলিল।

কিন্তু শ্বেতপত্র প্রকাশের পর মূল আলোচনায় আসে একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক—৪২১১.২২ লাখ টাকা। গণমাধ্যমে সেটিই রূপ নেয় ৪ হাজার ২১১ কোটি টাকায়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, শ্বেতপত্রে কোথাও ‘মুজিব ভাই’ সিনেমার নির্মাণ ব্যয় হিসেবে ৪ হাজার কোটি টাকার কোনো উল্লেখ নেই। বরং সেখানে আছে ৪২১১.২২ লাখ টাকার একটি হিসাব, যা সংখ্যাগতভাবে দাঁড়ায় প্রায় ৪২ কোটি ১১ লাখ ২২ হাজার টাকা।

অর্থনীতিবিদ ও হিসাববিদদের মতে, ৪২১১.২২ লাখ টাকা কখনোই ৪ হাজার কোটি টাকা হতে পারে না। লাখ থেকে কোটিতে রূপান্তর করলে অঙ্কটি দাঁড়ায় মাত্র ৪২ কোটি টাকার কিছু বেশি। তবু ভুল ব্যাখ্যা বা অসতর্ক উপস্থাপনার মাধ্যমে এই সংখ্যাই দুই দিন ধরে দেশের বহু গণমাধ্যমে ‘৪ হাজার কোটি টাকা’ হিসেবে প্রচারিত হয়।

শ্বেতপত্রের ফ্যাক্ট ১২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, করদাতাদের অর্থ ব্যবহার করে আইসিটি ডিভিশন অনুৎপাদনশীল ও দলীয় কার্যক্রমে অর্থ ব্যয় করেছে—এমন অভিযোগ রয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের সঙ্গে আইসিটি ডিভিশনের একাধিক সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে প্রকল্পের অর্থ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসম্পন্ন কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়। এসব কর্মকাণ্ডের মধ্যে ‘খোকা’ নামের অ্যানিমেটেড সিরিজ এবং ‘মুজিব ভাই’ শীর্ষক অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্রের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

শ্বেতপত্রে আরও বলা হয়, আইসিটি ডিভিশনের তহবিল থেকে মোট ৪২১১.২২ লাখ টাকা রাজনৈতিক প্রচারণামূলক কার্যক্রমে ব্যয় করা হয়েছে। এখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়নি যে এই পুরো অর্থ শুধু ‘মুজিব ভাই’ সিনেমার নির্মাণ ব্যয়। বরং এটি বিভিন্ন অডিও-ভিজ্যুয়াল ও প্রচারণামূলক কার্যক্রমের সম্মিলিত ব্যয়।

একই প্রসঙ্গে শ্বেতপত্রে ৭ মার্চের ভাষণ (২০১৭), ‘মুজিব ভাই’ (২০২৩), ‘খোকা’ এবং ‘সমৃদ্ধ আগামীর প্রতিচ্ছবি’ (২০২৩) নামের উদ্যোগগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলোকে রাজনৈতিক ব্র্যান্ডিং ও দলীয় বয়ান জোরদারের উপকরণ হিসেবে সমালোচনা করা হয়েছে। তবে কোথাও আলাদাভাবে ‘মুজিব ভাই’ চলচ্চিত্রের নির্মাণ ব্যয় নির্দিষ্ট করে উল্লেখ নেই।

‘মুজিব ভাই’ অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্রটির প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয় ২০২৩ সালের ২৩ জুন রাজধানীর স্টার সিনেপ্লেক্সে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি তৈরি করে আইসিটি বিভাগের মোবাইল গেম ও অ্যাপ্লিকেশন দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প। চলচ্চিত্রটির পরিচালক ছিলেন চন্দন কুমার বর্মন ও সোহেল মোহাম্মদ।

চলমান বিতর্ক প্রসঙ্গে নির্মাতা আনন্দ কুটুম জানান, তিনি যতদূর জানেন, সিনেমাটির বাজেট ছিল আনুমানিক ৪ কোটি টাকার মতো, যা অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে খুব বড় অঙ্ক নয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ অর্থের একটি অংশ কর্পোরেট স্পন্সরশিপ থেকেও এসেছে বলে তিনি শুনেছিলেন। তার মতে, ৪ হাজার কোটি টাকার দাবি সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য এবং বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

সব মিলিয়ে শ্বেতপত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, ‘মুজিব ভাই’ সিনেমা নির্মাণে ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের যে দাবি ছড়িয়েছে, তার কোনো ভিত্তি নেই। মূলত রাজনৈতিক প্রচারণামূলক একাধিক কার্যক্রমে ব্যয় হওয়া ৪২ কোটি টাকার একটি সম্মিলিত অঙ্ক ভুলভাবে ব্যাখ্যা ও উপস্থাপনের ফলেই এই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

সূত্রঃ আইসিটি বিভাগ

এম.কে

আরো পড়ুন

হত্যা ও সহিংসতার দায়ে শেখ হাসিনাকে জবাবদিহির মুখোমুখি দেখতে চায় জাতিসংঘ

রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ছে হু হু করে

লালমনিরহাটে পিটিয়ে হত্যার পর আগুনে পোড়ানো নিহত ব্যক্তিটি কে ছিলেন

অনলাইন ডেস্ক