17.7 C
London
October 13, 2026
TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

মুসলমানদের রক্ষার দাবি থেকে রক্তাক্ত প্রতিবাদঃ ১৩ সেনা হত্যায় দণ্ডিত নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের হাত থেকে আফগানিস্তানের মুসলমানদের রক্ষা করার বিশ্বাস থেকেই সহিংসতার পথ বেছে নিয়েছিলেন সাবেক মার্কিন সেনা কর্মকর্তা মেজর নিদাল হাসান। ২০০৯ সালে টেক্সাসের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে গুলিবর্ষণ করে ১৩ জনকে হত্যা এবং আরও ৩২ জনকে আহত করার দায়ে তিনি দণ্ডিত হন। এবার তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য ইন্টারনেটে সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর। তবে এ সিদ্ধান্তের আইনগত বৈধতা ও মানবিক দিক নিয়ে ইতোমধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

ভার্জিনিয়ার বাসিন্দা নিদাল হাসান ছিলেন মার্কিন সেনাবাহিনীর একজন মেজর ও মনোরোগ চিকিৎসক। ২০০৯ সালের ৫ নভেম্বর ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটির একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে তিনি গুলি চালান। ওই হামলায় ১৩ জন নিহত এবং ৩২ জন আহত হন। হামলার সময় হাসান নিজেও গুলিবিদ্ধ হন। বর্তমানে তিনি হুইলচেয়ারে চলাফেরা করেন।

২০১৩ সালে সামরিক আদালতে বিচার চলাকালে হাসান বলেছিলেন, তার বিশ্বাস ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর হাত থেকে আফগানিস্তানের মুসলমান ও তালেবানকে রক্ষা করছেন তিনি। তার বক্তব্যে আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক অভিযানের প্রতি বিরোধিতা এবং মুসলমানদের রক্ষার ধারণা উঠে আসে। তবে এই বিশ্বাস থেকে তিনি যে সহিংস পথ বেছে নিয়েছিলেন, তাতে প্রাণ হারান ১৩ জন মানুষ।

পেন্টাগনের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ৩ ডিসেম্বর হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে গুলি করে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য ইন্টারনেটে সরাসরি সম্প্রচারের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ পরিকল্পনার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তবে সম্প্রচারের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের দাবি, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করা হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু সমালোচকেরা বলছেন, একজন দণ্ডিত ব্যক্তির মৃত্যুকে সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে প্রদর্শনীর বিষয় বানানো হলে তা ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্য ও মানবিক মর্যাদা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলবে।

হাসানের আইনজীবী জন গ্যালিগান এ উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন। তার মতে, পুরো ঘটনাটিকে এক ধরনের প্রদর্শনীতে পরিণত করা হচ্ছে। তিনি অতীতের গণপিটুনির মানসিকতার সঙ্গেও এর তুলনা করেছেন। ফোর্ট হুডের হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া সাবেক সেনাসদস্য আলোনজো লান্সফোর্ডও মৃত্যুদণ্ডের দৃশ্য সবার জন্য সরাসরি সম্প্রচারের বিরোধিতা করেছেন। তার মতে, এ দৃশ্য দেখার সুযোগ মূলত নিহতদের পরিবার, আহত ব্যক্তি এবং হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের মধ্যে সীমিত রাখা উচিত।

জাতিসংঘও এ পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। সংস্থাটির মুখপাত্র স্তেফান দুজারিক বলেছেন, জনসমক্ষে কিংবা ক্যামেরার সামনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ধারণা তার কাছে ঘৃণ্য। জাতিসংঘের আশঙ্কা, এ ধরনের সম্প্রচার নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ কিংবা শাস্তির পর্যায়ে পড়তে পারে, যা আন্তর্জাতিক আইনে নিষিদ্ধ। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর সহিংস দৃশ্য প্রকাশসংক্রান্ত নীতিমালাও সরাসরি সম্প্রচারের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে জনসমক্ষে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ইতিহাসও দীর্ঘদিনের বিতর্কের বিষয়। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৩৬ সালে কেনটাকি অঙ্গরাজ্যে রেইনি বেথিয়ার প্রকাশ্য ফাঁসি দেখতে আনুমানিক ২০ হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিল। নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচার করা হলে তা যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য অনলাইনে সরাসরি প্রচারের প্রথম ঘটনা হতে পারে।

নিদাল হাসানের ঘটনা একদিকে আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক অভিযানের বিরোধিতা থেকে জন্ম নেওয়া তার বিশ্বাস ও সহিংসতার পথ বেছে নেওয়ার বিষয়টি সামনে এনেছে, অন্যদিকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য জনসমক্ষে প্রচার করা কতটা ন্যায়সংগত, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। অপরাধের বিচার ও শাস্তি কার্যকর করা আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হলেও, মৃত্যুর দৃশ্যকে প্রদর্শনীতে পরিণত করা উচিত কি না, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্ক চলছে।

সূত্রঃ বিবিসি বাংলা

এমকে

আরো পড়ুন

ইরানের জনগণ পাহলভিকে মেনে নেবে কি না সন্দেহ আছেঃ ট্রাম্প

ফেরেশতাদের শব্দ রেকর্ড করলো নাসা?

গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়, ট্রাম্পের জবাবে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী